বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের তালিকায় নতুন একটি অধ্যায় যোগ করল আর্জেন্টিনা। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত লড়াই করে ৩-২ ব্যবধানে মিশরকে হারিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। অধিনায়ক লিওনেল মেসির অসাধারণ গোল এবং যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক হেডে রুদ্ধশ্বাস জয় তুলে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।
এই নাটকীয় জয়ে শুধু টুর্নামেন্টে নিজেদের টিকিয়েই রাখেনি আর্জেন্টিনা, বরং দেখিয়ে দিয়েছে কেন তারা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা দল হিসেবে বিবেচিত।
ম্যাচের শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে থাকে মিশর। শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে কোনো ভয় না পেয়ে আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করে উত্তর আফ্রিকার দলটি।
প্রথমার্ধে ইয়াসের ইব্রাহিম গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। এরপর দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে মোস্তাফা জিকো ব্যবধান দ্বিগুণ করলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি মিশরের হাতে চলে যায়। তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি ঘটতে যাচ্ছে।
দুই গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা তখন মরিয়া হয়ে আক্রমণ শুরু করে। ম্যাচের শেষ দিকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো কর্নার থেকে আসা বল হেডে জালে পাঠিয়ে ব্যবধান ২-১ করেন।
এই গোলের পরই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা। খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, আর মিশরের রক্ষণভাগের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
রোমেরোর গোলের কিছুক্ষণ পরই নিজের জাদু দেখান লিওনেল মেসি। বক্সের ভেতর বল পেয়ে শক্তিশালী শটে ক্রসবারের নিচে লাগিয়ে জালে বল পাঠান তিনি।
মেসির এই গোল শুধু ম্যাচে সমতা ফেরায়নি, পুরো স্টেডিয়ামের পরিবেশও বদলে দেয়। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে গ্যালারি, আর মিশরের খেলোয়াড়দের মধ্যে স্পষ্টভাবে চাপ দেখা যায়।
বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আবারও দলের ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মেসি।
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তখনও মনে হচ্ছিল লড়াইটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে পারে। কিন্তু যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে আসে নাটকীয় মোড়।
ডান দিক থেকে ভেসে আসা নিখুঁত ক্রসে অসাধারণ হেড করেন এনজো ফার্নান্দেজ। বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনা শিবির।
৯৩তম মিনিটের এই গোলেই নিশ্চিত হয় ৩-২ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয়।
এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের মানসিক দৃঢ়তা। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও তারা আত্মবিশ্বাস হারায়নি। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই তাদের জয় এনে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এমন প্রত্যাবর্তন কেবল দক্ষতা নয়, বরং দলীয় ঐক্য, অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাসেরও প্রতিফলন।
পরাজিত হলেও মিশর দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়েছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তারা দীর্ঘ সময় এগিয়ে ছিল এবং আর্জেন্টিনাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল।
রক্ষণ ও পাল্টা আক্রমণে তাদের পরিকল্পনা বেশ সফল ছিল। তবে ম্যাচের শেষ কয়েক মিনিটে অভিজ্ঞতার অভাব এবং চাপ সামলাতে না পারার কারণে জয় হাতছাড়া হয়ে যায়।
তবুও এই পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের জন্য মিশরকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
এই জয়ের ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। শেষ মুহূর্তের এই নাটকীয় জয় দলের মনোবল অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে।
বিশেষ করে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো এবং এনজো ফার্নান্দেজের পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।
আগামী ম্যাচে এই আত্মবিশ্বাসই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন নাটকীয় ম্যাচ খুব কমই দেখা যায়। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করেছে কেন তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
মেসির অনবদ্য গোল, রোমেরোর গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের সূচনা এবং এনজো ফার্নান্দেজের শেষ মুহূর্তের জয়সূচক হেড ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘদিন মনে থাকবে। অন্যদিকে, মিশর পরাজিত হলেও সাহসী লড়াই দিয়ে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত অনিশ্চয়তার খেলা—আর্জেন্টিনা ও মিশরের এই রুদ্ধশ্বাস লড়াই তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

