ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যা শুধু ফলাফলের জন্য নয়, বরং নাটকীয়তা, আবেগ এবং অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের জন্য বহু বছর ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকে। মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই ম্যাচটি ঠিক তেমনই এক লড়াই। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় আর্জেন্টিনা। আর এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
ম্যাচের ফল
আর্জেন্টিনা ৩-২ মিশর
আর্জেন্টিনার গোল: রোমেরো, মেসি, এঞ্জো
মিশরের গোল: ইব্রাহিম, জ়িকো
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে মিশর। গতি, পাসিং এবং সংগঠিত আক্রমণে তারা বারবার চাপে ফেলে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে। প্রথমার্ধেই ইব্রাহিমের দুর্দান্ত হেডে এগিয়ে যায় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। এরপর জ়িকোর গোলে ব্যবধান আরও বাড়লে আর্জেন্টিনার বিদায় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল।
গ্যালারিতে তখন হতাশা। মাঠে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মধ্যেও ছিল চাপের ছাপ। কিন্তু এমন মুহূর্তেই নিজের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দেন লিওনেল মেসি।
ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। সেই সুযোগ থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন মেসি। তাঁর শট সহজেই আটকে দেন মিশরের গোলরক্ষক মুস্তাফা শোবর। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস।
পেনাল্টি মিস করার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এটাই আর্জেন্টিনার শেষ সুযোগ ছিল। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের মানসিক দৃঢ়তা এখানেই আলাদা। হতাশায় ভেঙে না পড়ে তিনি আরও বেশি দায়িত্ব নেন এবং পুরো দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।
দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আর্জেন্টিনাকে দেখা যায়। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় তারা। দ্রুত আক্রমণ, নিখুঁত পাস এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ বাড়াতে শুরু করে।
প্রথমে রোমেরোর গোলে ব্যবধান কমে ২-১ হয়। এরপর নিজের স্বভাবসুলভ দক্ষতায় দুর্দান্ত এক গোল করে সমতা ফেরান মেসি। সেই গোল যেন পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সমতা ফেরানোর পর আর্জেন্টিনা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এঞ্জোর গোলে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। শেষ বাঁশি বাজতেই আনন্দে ফেটে পড়ে পুরো দল।
ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যায় এক ভিন্ন মেসিকে। সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। চোখের জল যেন বলে দিচ্ছিল, এই জয়ের মূল্য কতটা বড়।
কয়েক মিনিট আগেও বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের শঙ্কায় ছিল আর্জেন্টিনা। সেই অবস্থা থেকে ফিরে এসে জয় পাওয়ার অনুভূতি ছিল ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সতীর্থরাও মেসিকে কাঁধে তুলে উদযাপন করেন। পুরো দৃশ্যটি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ছিল আবেগঘন এক মুহূর্ত।
এই ম্যাচে আবারও পরিষ্কার হয়েছে, আর্জেন্টিনা এখনও অনেকটাই মেসিনির্ভর। প্রতিপক্ষ শুরু থেকেই তাঁকে ঘিরে রাখার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু অন্য আক্রমণভাগের ফুটবলাররা দীর্ঘ সময় নিজেদের সেরাটা দেখাতে পারেননি।
বিশেষ করে হুলিয়ান আলভারেজ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। ম্যাচজুড়ে তিনি খুব বেশি প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হন। কয়েক বছর আগে যেখানে আর্জেন্টিনার একাধিক ফুটবলার গোল করে মেসির চাপ কমিয়েছিলেন, এবার সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি।
হারের পরও মিশরের পারফরম্যান্স প্রশংসার দাবিদার। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা সাহসী ও সংগঠিত ফুটবল খেলেছে। ইব্রাহিম, হাসান ও জ়িকো একাধিক আক্রমণ গড়ে তুলে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছিলেন।
ম্যাচের আগে মিশরের ফুটবল পরিচালক হাসান বলেছিলেন, তাঁদের দলে “২৬ জন মেসি” আছেন। কথাটি অতিরঞ্জিত হলেও মাঠের খেলায় মিশরের আত্মবিশ্বাস ও দলগত পারফরম্যান্স সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন ছিল।
এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি প্রথম একাদশে তিনটি পরিবর্তন আনেন। নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকো, লিয়ান্দ্রো পারেদেস এবং হুলিয়ান আলভারেজকে শুরু থেকেই খেলান তিনি।
তবে প্রথমার্ধে এই পরিবর্তনের সুফল খুব একটা পাওয়া যায়নি। দল ধীরগতির ফুটবল খেলায় মিশরের প্রেসিংয়ের সামনে বারবার সমস্যায় পড়ে। বিরতির পর কৌশল বদলানো এবং খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তাই শেষ পর্যন্ত জয়ের পথ তৈরি করে।
এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজেদের অভিযান ধরে রাখল আর্জেন্টিনা। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও যেভাবে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা নিঃসন্দেহে দলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে।
অন্যদিকে, এই ম্যাচে আবারও প্রমাণ করলেন লিওনেল মেসি কেন তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হয়। গোল, নেতৃত্ব এবং কঠিন মুহূর্তে দলকে টেনে তোলার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রেখে গেলেন।
মিশরের বিপক্ষে এই ম্যাচটি শুধু একটি জয় নয়, বরং সাহস, বিশ্বাস এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। যখন মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে, তখনই মেসির নেতৃত্বে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখায় দলটি।
ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়—আর্জেন্টিনার এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন সেই সত্যকেই আবারও নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

