মানুষের জীবনে বন্ধুত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। শৈশব থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলেও সবাই সমানভাবে কাছের হয়ে ওঠেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে বেছে নিই, যাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয় এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রবণতা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিম্পাঞ্জিরাও মানুষের মতোই বন্ধুত্ব গড়ে তোলে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামাজিক বৃত্তও ছোট হয়ে আসে।
অনেকের ধারণা, শিম্পাঞ্জি মানুষের পূর্বপুরুষ। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। বিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি উভয়েই একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে পৃথক ধারায় বিবর্তিত হয়েছে। সেই কারণেই দুই প্রজাতির মধ্যে কিছু আচরণগত মিল আজও লক্ষ্য করা যায়।
নেদারল্যান্ডসের ইউটরেক্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্পেনের কার্লোস থ্রি ইউনিভার্সিটি অব মাদ্রিদের একদল গবেষক দীর্ঘদিন ধরে শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোদের সামাজিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা মানুষের সামাজিক জীবনের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিম্পাঞ্জিরা দলের সব সদস্যের সঙ্গে সমান সম্পর্ক বজায় রাখে না। বরং তারা নির্দিষ্ট কয়েকজনকে বেছে নেয় এবং তাদের সঙ্গেই অধিকাংশ সময় কাটাতে পছন্দ করে।
মানুষ যেমন শত পরিচিত মানুষের মধ্যে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তোলে, শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। তারা সচেতনভাবে কিছু সঙ্গীর সঙ্গে গভীর সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সেই সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখে।
গবেষকরা মনে করেন, এই আচরণ জটিল সামাজিক কাঠামো গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এটি প্রমাণ করে যে সামাজিক বন্ধন তৈরির মৌলিক প্রবণতা মানুষের আগেও বিবর্তনের ধারায় বিদ্যমান ছিল।
শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোদের মধ্যে ‘সামাজিক গ্রুমিং’ বা একে অপরের শরীর পরিষ্কার করার আচরণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতার কাজ নয়, বরং সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি কার্যকর উপায়।
গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, প্রাণীগুলো নিজেদের পরিচর্যা করার পাশাপাশি একে অপরের শরীর পরিষ্কার করে, সময় কাটায় এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ায়। এই গ্রুমিংয়ের মাধ্যমেই তাদের মধ্যে বিশ্বাস, সহযোগিতা এবং বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বানরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যে এই আচরণ সামাজিক সংযোগের অন্যতম শক্তিশালী প্রকাশ।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আধুনিক গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোদের সামাজিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। ফলাফলে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রাণীই সীমিত সংখ্যক সঙ্গীর সঙ্গে বেশি সময় কাটায় এবং বাকিদের সঙ্গে তুলনামূলক কম যোগাযোগ রাখে।
এই আচরণ মানুষের সামাজিক জীবনের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। বাস্তব জীবনেও একজন মানুষের পরিচিত মানুষের সংখ্যা অনেক হলেও ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকে হাতে গোনা কয়েকজন।
গবেষকরা মনে করেন, সময় ও মানসিক শক্তির সীমাবদ্ধতার কারণেই প্রাণীরা বেছে বেছে সম্পর্ক তৈরি করে। এর ফলে কিছু সম্পর্ক গভীর হয়, আবার কিছু সম্পর্ক কেবল পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বড় গোষ্ঠীতে বসবাসকারী শিম্পাঞ্জিরা বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে আরও বেশি বেছে নেয়। অর্থাৎ দলের সদস্য সংখ্যা যত বেশি হয়, তারা তত বেশি সতর্কভাবে নিজেদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী নির্বাচন করে।
এটি মানুষের আচরণের সঙ্গেও মিল খুঁজে দেয়। কারণ বড় সামাজিক পরিসরে থাকা মানুষও সাধারণত সীমিত সংখ্যক মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে।
গবেষকদের মতে, এই প্রবণতা সামাজিক শক্তি ও সময়ের কার্যকর ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে শিম্পাঞ্জিরা সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
যদিও শিম্পাঞ্জি ও বোনোবো একই পরিবারের প্রাণী, তবুও তাদের সামাজিক আচরণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বোনোবোরা দলের প্রায় সব সদস্যের সঙ্গে সমানভাবে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করে। ফলে তাদের সমাজে তুলনামূলক সমতাভিত্তিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
অন্যদিকে শিম্পাঞ্জিরা নির্দিষ্ট কয়েকজন সঙ্গীর ওপর বেশি মনোযোগ দেয় এবং সেই সম্পর্কগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে তাদের সামাজিক বৃত্ত অপেক্ষাকৃত ঘনিষ্ঠ কিন্তু সীমিত হয়।
মানুষের জীবনে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুবৃত্ত ছোট হয়ে আসে। অনেক পুরোনো সম্পর্ক দূরে সরে যায়, আর মানুষ বেশি সময় দেয় নির্বাচিত কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে।
একই চিত্র দেখা গেছে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও। গবেষণায় দেখা যায়, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা নতুন সম্পর্ক তৈরির আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগের পরিধিও সংকুচিত হয়।
তবে বোনোবোদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ততটা স্পষ্ট নয়। তারা দীর্ঘ সময় ধরে বৃহত্তর সামাজিক নেটওয়ার্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
গবেষণার প্রধান গবেষক এডউইন ভ্যান লিউয়েনের মতে, সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলার মৌলিক নিয়ম সব প্রজাতির মধ্যেই প্রায় একই রকম। এই মিল প্রমাণ করে যে জটিল সামাজিক কাঠামো হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, বরং দীর্ঘ বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিকশিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং সামাজিক যোগাযোগ শুধু মানুষের সমাজের বৈশিষ্ট্য নয়; বরং এগুলো প্রাণিজগতের গভীরে প্রোথিত একটি বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য।
সাম্প্রতিক এই গবেষণা মানুষের সামাজিক আচরণ সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে। শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে বন্ধুত্ব, সঙ্গী নির্বাচন, সামাজিক বৃত্ত তৈরি এবং বয়সের সঙ্গে সম্পর্কের পরিধি সংকুচিত হওয়ার প্রবণতা প্রমাণ করে যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি অনেক গভীরে প্রোথিত।
এই আবিষ্কার শুধু প্রাণীদের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, মানুষের সমাজ ও সম্পর্কের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বন্ধুত্ব যে কেবল মানুষের একান্ত বৈশিষ্ট্য নয়, বরং প্রকৃতির বৃহত্তর সামাজিক ব্যবস্থার একটি অংশ— সেই সত্যই আবারও সামনে এনে দিয়েছে শিম্পাঞ্জিদের এই গবেষণা।

