যুক্তরাজ্যের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব গ্রহণের পরই জনগণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলাকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে জানান, সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কমাতে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে আগামী মঙ্গলবার (২১ জুলাই) থেকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন নীতিগত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে, যাতে জনগণ দ্রুত কিছুটা স্বস্তি পেতে শুরু করে।
সোমবার (২০ জুলাই) প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদনে নতুন প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া ভাষণে তিনি শিক্ষা, আবাসন, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়নসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা কমানো এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। তিনি জানান, সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে ঘোষণা করা হবে এবং প্রতিটি উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়েও জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা করাই নয়, এসব প্রকল্পের অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়িত হবে, সেই বিষয়েও সরকার স্বচ্ছতা বজায় রাখবে।
নতুন প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা খাতকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, আধুনিক ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করে আরও বেশি তরুণ-তরুণীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। সরকারের লক্ষ্য হবে এমন একটি শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা, যা কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে আবাসন সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করেন বার্নহ্যাম। তিনি বলেন, অনেক পরিবার এখনো সাশ্রয়ী মূল্যের বাসস্থানের অভাবে ভুগছে।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকার আরও বেশি কাউন্সিল হাউজ বা সরকারি আবাসন নির্মাণ করবে। তাঁর মতে, ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই উপায়ে আবাসন সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বাসস্থানের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এটি কল্যাণ ব্যয়ের ওপর সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চাপও কমাবে।
সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়েও দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা দেন, তাঁর প্রথম দিকের অন্যতম নির্দেশ হবে যুক্তরাজ্যে খোলা আকাশের নিচে বসবাস বা ‘রাফ স্লিপিং’ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা।
বার্নহ্যামের মতে, উন্নত একটি দেশে কোনো মানুষ যেন বাধ্য হয়ে রাস্তায় রাত কাটাতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এ জন্য আবাসন, সামাজিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তিনি বলেন, দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুধু ওয়েস্টমিনস্টারকেন্দ্রিক থাকলে উন্নয়নের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার ও আঞ্চলিক প্রশাসনের হাতে আরও বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হবে। এর ফলে প্রতিটি অঞ্চল নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিষয়েও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যেখানে জনগণের প্রয়োজনীয় মৌলিক সেবাগুলো আবারও জননিয়ন্ত্রণে আনা হবে।
তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য, পরিবহন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে পুনরায় শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন ও শিল্পখাতকে আরও শক্তিশালী করা হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল হবে।
বার্নহ্যাম জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সরকার একটি ১০ বছরের জাতীয় পরিকল্পনা প্রকাশ করবে। এই দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, অবকাঠামো, জনকল্যাণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও কৌশল তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হবে।
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী আবারও আশ্বাস দেন যে জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সরকারের পরিকল্পনা আর বিলম্বিত হবে না। আগামী মঙ্গলবার থেকেই ধাপে ধাপে বিভিন্ন উদ্যোগ প্রকাশ করা হবে এবং প্রতিটি কর্মসূচির অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের কৌশল জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো নয়; বরং এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা, উন্নত জীবনমান এবং স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।

