ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে আয়োজন করা হয়েছিল বিশাল হাফটাইম শো। আয়োজকদের আশা ছিল, সুপার বোলের মতো জাঁকজমকপূর্ণ এই অনুষ্ঠান বিশ্বকাপের বিনোদনের নতুন অধ্যায় খুলে দেবে। মঞ্চে ছিলেন ম্যাডোনা, শাকিরা, জাস্টিন বিবার, বিটিএস, কোল্ডপ্লে, বার্না বয়সহ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকারা। কিন্তু এত তারকার উপস্থিতিও সবাইকে খুশি করতে পারেনি। বরং অনেক ফুটবল সমর্থক অনুষ্ঠানটিকে “অগোছালো”, “অপ্রয়োজনীয়” এবং “ফুটবলের আবেগ থেকে বিচ্ছিন্ন” বলে সমালোচনা করেছেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম হাফটাইম শো নিয়ে তাই যেমন উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তেমনই তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও স্পেন। ম্যাচ শুরুর আগেই পুরো স্টেডিয়াম উৎসবের রূপ নেয়। বিশ্বকাপ ট্রফি বিশেষ লুই ভুইতোঁর তৈরি একটি কেসে করে মাঠে আনা হয়, যা দর্শকদের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করে।
তবে সেদিন ট্রফি বা দুই ফাইনালিস্ট দলই ছিল না একমাত্র আকর্ষণ। ফুটবলের পাশাপাশি বিনোদনকে সামনে এনে ফিফা আয়োজন করেছিল এক বিশাল হাফটাইম শো। আর সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়।
হাফটাইম শোর শুরুতেই মঞ্চে ওঠেন পপ সংগীতের কিংবদন্তি ম্যাডোনা। তিনি তার জনপ্রিয় গান Music পরিবেশন করেন। সেই পারফরম্যান্সে সাম্প্রতিক সংগীতের উপাদানও যুক্ত করেন, যা দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তার প্রবেশ। একটি গোলাপি জিপে করে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন ম্যাডোনা। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো ও রোনালদিনিয়ো। এই দৃশ্য অনেক দর্শকের কাছে ছিল অবিস্মরণীয়।
ম্যাডোনা যখন “Music brings the people together” লাইনটি গাইছিলেন, তখন পুরো স্টেডিয়াম আলো আর সঙ্গীতে ভরে ওঠে।
ম্যাডোনার পর মঞ্চে আসে দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড বিটিএস। তারা তাদের জনপ্রিয় গান Dynamite পরিবেশন করে দর্শকদের মাতিয়ে তোলে।
এরপর মঞ্চে দেখা যায় জনপ্রিয় সিরিজ Ted Lasso-এর চরিত্র টেড ল্যাসো ও কোচ বিয়ার্ডকে। তাদের উপস্থিতির পর মাঠে আসেন কানাডিয়ান পপ তারকা জাস্টিন বিবার।
জাস্টিন বিবার তার গান Everything Hallelujah পরিবেশন করেন। যদিও তার ভক্তদের একটি অংশ পারফরম্যান্স উপভোগ করলেও অনেক দর্শক মনে করেছেন, তার পরিবেশনা প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই নিস্তেজ ছিল।
বিশ্বকাপ মানেই শাকিরা—এমন ধারণা বহু ফুটবলপ্রেমীর। তাই শাকিরার মঞ্চে ওঠার মুহূর্তটি ছিল পুরো অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।
শাকিরা বার্না বয় এবং অসংখ্য নৃত্যশিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে পরিবেশন করেন Dai Dai, যা ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান। প্রাণবন্ত নাচ, আলোকসজ্জা এবং দর্শকদের অংশগ্রহণে সেই অংশটি সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস তৈরি করে।
এরপর কোল্ডপ্লে ও পিএস২২ কোরাস একসঙ্গে We Believe in Love গান পরিবেশন করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যায়।
সবাই যে এই আয়োজন পছন্দ করেছেন, তা নয়। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ওয়েন রুনি প্রকাশ্যে হাফটাইম শোর সমালোচনা করেন।
যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় অনুষ্ঠানের সবচেয়ে ভালো অংশ কোনটি ছিল, তখন তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে যখন অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে।”
রুনি আরও বলেন, তিনি অনেক শিল্পীকেই ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন। কিন্তু পুরো অনুষ্ঠান তাকে একদমই আকৃষ্ট করতে পারেনি। তার মতে, ফুটবল ম্যাচের গতি থামিয়ে এত দীর্ঘ বিনোদন আয়োজন ম্যাচের আবেগকে নষ্ট করেছে।
বিশেষ করে জাস্টিন বিবারের পারফরম্যান্স সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন যে সেটি ছিল অনেকটাই “ফ্ল্যাট” বা প্রাণহীন।
ওয়েন রুনির মতো কঠোর সমালোচনা না করলেও সংগীতশিল্পী লিয়াম গ্যালাঘারও হাফটাইম শো নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
তিনি জাস্টিন বিবারের প্রশংসা করলেও পুরো অনুষ্ঠানকে কিছুটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেন। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এত ভিন্নধর্মী পারফরম্যান্স একসঙ্গে দেখানোয় অনুষ্ঠানটি অনেকের কাছেই বিচ্ছিন্ন ও অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমেও দেখা গেছে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া। একদল সমর্থক মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো বিশাল মঞ্চে এমন বৈশ্বিক বিনোদন আয়োজন ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করবে।
বিশেষ করে ম্যাডোনার সঙ্গে রোনালদো ও রোনালদিনিয়োর প্রবেশকে অনেকেই “আইকনিক মুহূর্ত” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে অনেক সমর্থকের অভিযোগ, বিশ্বকাপের আসল আকর্ষণ ফুটবল। তারা মনে করেন, অতিরিক্ত বিনোদনের কারণে ম্যাচের আবেগ ও গতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাফটাইম শোর আগেও স্টেডিয়ামে ছিল সংগীত ও বিনোদনের ঝলক।
আইশোস্পিড মঞ্চে উঠে Champions গান পরিবেশন করেন। এরপর পোস্ট ম্যালোন গেয়ে শোনান তার জনপ্রিয় গান Wow., Sunflower এবং Chrome Heartbreaker।
জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনেও ছিল বিশেষ আয়োজন। জেনিফার হাডসন গেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত। স্প্যানিশ ব্রাস পরিবেশন করেছে স্পেনের জাতীয় সঙ্গীত, আর মারিয়া বেসেরা গেয়েছেন আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত।
এছাড়াও রবি উইলিয়ামস, লরা পাওসিনি এবং নিকোল শেরজিঙ্গার একসঙ্গে ফিফার গান Desire পরিবেশন করেন।
ফিফার এই উদ্যোগ ফুটবল বিশ্বে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে এটি বিশ্বকাপকে আরও বড় বিনোদনমঞ্চে পরিণত করেছে। অন্যদিকে অনেক ঐতিহ্যপ্রেমী সমর্থক মনে করেন, বিশ্বকাপের সৌন্দর্য তার ফুটবলে, অতিরিক্ত প্রদর্শনীতে নয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রথম বিশ্বকাপ হাফটাইম শো নিয়ে মতভেদ থাকলেও এটি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলোতেও এমন আয়োজন হবে কি না, আর হলে সমর্থকরা সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

