ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আবারও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল স্পেন। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে নতুন ইতিহাস গড়ল ইউরোপের এই শক্তিশালী দল। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করে তারা ১-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় মুহূর্তে ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলেই নিশ্চিত হয় স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা।
অন্যদিকে, টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার। পুরো ম্যাচে আক্রমণে কার্যত অদৃশ্য ছিল দলটি। বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় মঞ্চে এমন নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স দেখে হতাশ হয়েছেন সমর্থকরাও।
খেলার প্রথম বাঁশি থেকেই বলের দখল, আক্রমণ এবং সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল স্পেনের। আর্জেন্টিনা নিজেদের অর্ধেই দীর্ঘ সময় কাটিয়েছে। স্পেন ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালালেও আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
প্রথমার্ধে গোল না হলেও স্পেনের আক্রমণের ধার কমেনি। দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র দেখা যায়। আর্জেন্টিনা খুব কম সময়ের জন্য বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। আক্রমণে ওঠার সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনও দল গোল করতে না পারায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। তখনও আক্রমণের ধার বজায় রাখে স্পেন। ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের নিখুঁত ক্রস থেকে বাঁ পায়ের শক্তিশালী শটে বল জালে জড়িয়ে দেন বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস।
এই গোলের পর আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও স্পেনের সুসংগঠিত রক্ষণ তাদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের জয় নিয়েই দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।
পুরো টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা লিওনেল মেসিকে ফাইনালে যেন খুঁজেই পাওয়া যায়নি। স্পেনের কড়া মার্কিংয়ের কারণে তিনি খুব কমবার বল স্পর্শ করার সুযোগ পান। সতীর্থরাও কার্যকরভাবে তার কাছে বল পৌঁছে দিতে পারেননি।
মেসি কয়েকবার নিচে নেমে খেলা গড়ার চেষ্টা করলেও স্পেনের মিডফিল্ড দ্রুত বল কেড়ে নেয়। ফলে আর্জেন্টিনার আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়।
বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে মেসির এমন নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স অনেককেই বিস্মিত করেছে।
পুরো ১২০ মিনিটের ম্যাচে আর্জেন্টিনা স্পেনের গোলমুখে একটি কার্যকর শটও নিতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচে এমন পরিসংখ্যান বিরল।
এর আগে নকআউট পর্বে পিছিয়ে থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফাইনালে তারা শুরু থেকেই রক্ষণাত্মক কৌশল নেয়। সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত তাদের বিপদ ডেকে আনে।
রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে আক্রমণের ধার পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে স্কালোনির দল।
যদিও আর্জেন্টিনা হেরেছে, তবুও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ছিলেন দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরমার। ম্যাচে তিনি মোট ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন, যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে অন্যতম সেরা গোলকিপিং পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইয়ামালের শক্তিশালী ফ্রি-কিক, উইলিয়ামসের হেড এবং একাধিক কাছাকাছি শট ঠেকিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় স্পেনকে হতাশ করেন। মার্তিনেজ না থাকলে নির্ধারিত সময়েই বড় ব্যবধানে হেরে যেতে পারত আর্জেন্টিনা।
অতিরিক্ত সময়ের আগে নিকো উইলিয়ামস বল জালে পাঠালেও গোলটি বাতিল করেন রেফারি। রিপ্লেতে দেখা যায়, গোল হওয়ার আগে মিকেল মেরিনো আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার ওটামেন্ডির বিরুদ্ধে ফাউল করেছিলেন।
রেফারির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে স্পেনের খেলোয়াড়রা আপত্তি জানালেও সিদ্ধান্ত বদল হয়নি। এরপরও আক্রমণের ধার বজায় রেখে শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করে স্পেন।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এঞ্জো ফার্নান্দেজ। ফলে শেষ ভাগে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় আর্জেন্টিনাকে।
একজন কম নিয়ে স্পেনের দ্রুতগতির আক্রমণ সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্পেন আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই চাপ থেকেই আসে জয়সূচক গোল।
স্পেনের ধারাবাহিক আক্রমণে রক্ষণ চাপে পড়ে যাওয়ায় আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি একের পর এক পরিবর্তন আনেন। রোমেরো, ডি পলসহ একাধিক ফুটবলারকে তুলে নতুন খেলোয়াড় নামানো হলেও তাতে ম্যাচের চিত্র বদলায়নি।
রক্ষণ শক্তিশালী করার চেষ্টা করতে গিয়ে আক্রমণভাগ প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে লাউতারো মার্তিনেজের মতো আক্রমণভাগের অস্ত্রও ঠিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ পাননি কোচ।
স্পেনের কোচ সঠিক সময়ে বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। নিকো উইলিয়ামস এবং ফেরান তোরেস মাঠে নেমেই আক্রমণে নতুন গতি আনেন।
শেষ পর্যন্ত এই দুই ফুটবলারের সমন্বয়েই আসে ফাইনালের একমাত্র গোল। কোচের কৌশল এবং বদলি খেলোয়াড়দের কার্যকারিতা স্পেনের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে স্পেন আবারও প্রমাণ করল, দলগত ফুটবল, দ্রুত পাসিং এবং সংগঠিত আক্রমণই আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নিল।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনাকে এই হার থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শুধুমাত্র রক্ষণাত্মক কৌশল নয়, আক্রমণেও সমান কার্যকর হতে হয়। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দলটি শেষ পর্যন্ত লড়াই করলেও স্পেনের দুর্দান্ত ফুটবলের সামনে তারা কোনো উত্তর খুঁজে পায়নি।
১৬ বছর পর বিশ্বকাপের মুকুট আবার স্পেনের মাথায় উঠল। ইতিহাসের পাতায় যোগ হল আরেকটি গৌরবময় অধ্যায়, আর আর্জেন্টিনার জন্য এটি হয়ে রইল অপূর্ণ স্বপ্নের এক বেদনাদায়ক সমাপ্তি।

