বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে সফল, টেকসই এবং স্থিতিশীলভাবে উত্তরণের লক্ষ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং গ্রুপ অব ৭৭ অ্যান্ড চায়না (জি-৭৭) আবারও তাদের পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরা হলে আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন।
এই বৈঠকগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ সদরদপ্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির পৃথকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের প্রধান রাষ্ট্রদূত স্টাভরোস ল্যামব্রিনিডিস এবং জি-৭৭ অ্যান্ড চায়নার চেয়ার ও জাতিসংঘে উরুগুয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
বৈঠকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি প্রতিনিধি এবং বেসরকারি খাতের নেতাদের একসঙ্গে উপস্থিতি বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমন্বিত অংশীদারিত্বের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বর্তমানে দেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি খাতের চাপ এবং চলমান কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রমের কারণে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই অতিরিক্ত সময় সরকারের চলমান সংস্কার কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেবে। পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ আরও গতিশীল হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি পেলে শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং বিদ্যমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যাবে। এর ফলে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ শুধু আনুষ্ঠানিক অর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উৎপাদন খাতের আধুনিকায়নের জন্য এই অতিরিক্ত সময় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের প্রধান রাষ্ট্রদূত স্টাভরোস ল্যামব্রিনিডিস বাংলাদেশের সুশাসন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।
তিনি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরুর বিষয়টিকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে ইইউ ভবিষ্যতেও সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা জরুরি। এতে অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
জি-৭৭ অ্যান্ড চায়নার চেয়ার রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরে বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাবকে যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
তিনি সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ যে বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে তিনি জি-৭৭-এর সদস্য দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কৌশল নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিফিং আয়োজনের প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।
বৈঠক শেষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ যেন মসৃণ, স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়, সে লক্ষ্যে ইইউ তাদের অব্যাহত সহযোগিতা ও সমর্থনের আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের এই ইতিবাচক অবস্থান বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় নতুন আস্থা তৈরি করবে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের পর এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই উত্তরণ দেশের জন্য যেমন নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করবে, তেমনি কিছু বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা হারানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়টি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের শিল্প, রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ইইউ এবং জি-৭৭-এর সমর্থন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই অর্থনীতির দিকে আরও একধাপ এগিয়ে যেতে পারবে।

