খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালযে মাঠে কেঁদেছিলেন মেসি, সেই মেটলাইফেই কি ইতিহাস গড়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতবেন?

যে মাঠে কেঁদেছিলেন মেসি, সেই মেটলাইফেই কি ইতিহাস গড়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতবেন?

২০২১ সালে দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষ করে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলের মাটিতে ঐতিহাসিক সেই সাফল্য মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

ফুটবলে এমন কিছু গল্প থাকে, যা পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি আবেগ ছড়িয়ে দেয়। লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের সঙ্গে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সম্পর্ক ঠিক তেমনই এক গল্প। একসময় এই মাঠেই ভেঙেছিল তাঁর হৃদয়, জন্ম নিয়েছিল আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত। আর এক দশক পরে, সেই একই মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। সময় যেন পূর্ণ বৃত্তে ফিরে এসেছে।

২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ চিলি। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময়েও গোলশূন্য ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেই শুটআউটে নিজের প্রথম কিকই লক্ষ্যভ্রষ্ট করেন লিওনেল মেসি। শেষ পর্যন্ত শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা।

ম্যাচ শেষে হতাশ মেসি জানিয়ে দেন, জাতীয় দলের হয়ে তাঁর পথচলা শেষ। কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল সেই ঘোষণা। ফুটবল বিশ্ব বিশ্বাসই করতে পারেনি, আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার এত দ্রুত বিদায় জানাবেন।

দশ বছর পর ইতিহাস যেন আবার একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। তবে এবার গল্পটা ভিন্ন। একই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মেসির সামনে রয়েছে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের বিরল সুযোগ।

ক্লাব ফুটবলে মেসির সাফল্য নিয়ে কখনও প্রশ্ন ওঠেনি। বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য ট্রফি, ব্যক্তিগত পুরস্কার এবং রেকর্ড তাঁকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা জিততে না পারায় তাঁকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল।

আরও পড়ুন :  আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগে ঝড়! রায়ান মেন্ডেজ বিতর্কে কেঁপে উঠল ফুটবল দুনিয়া

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়া, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার—সব মিলিয়ে মেসির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছিল। অনেকেই তাঁকে দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করে প্রশ্ন তুলেছিলেন, দেশের হয়ে তিনি কি সত্যিই সফল?

ঠিক সেই সময়েই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ২০১৬ সালে পর্তুগালকে ইউরো চ্যাম্পিয়ন করেন। ফলে মেসির সমালোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

কোপা আমেরিকার সেই হারের পর আবেগঘন কণ্ঠে মেসি বলেছিলেন, তিনি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন, কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার কষ্ট তাঁকে ভেঙে দিয়েছে। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

তবে ফুটবলপ্রেমী, সাবেক খেলোয়াড়, সতীর্থ এবং আর্জেন্টিনার কোটি সমর্থক তাঁকে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। শেষ পর্যন্ত কয়েক মাসের মধ্যেই নিজের সিদ্ধান্ত বদলান মেসি এবং আবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলেন।

সেই প্রত্যাবর্তনই বদলে দেয় আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাস।

জাতীয় দলে ফিরে আসার পরও শুরুটা খুব সহজ ছিল না। ২০১৯ সালেও শিরোপা অধরা থেকে যায়। কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে আর্জেন্টিনার ভাগ্য।

আরও পড়ুন :  ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও বিশ্বকাপে জয়ের স্বপ্ন দেখছে ইরান

২০২১ সালে দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষ করে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলের মাটিতে ঐতিহাসিক সেই সাফল্য মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

এরপর আসে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। কাতারের মঞ্চে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। একই সময় ফিনালিসিমাও জেতে দলটি। এরপর ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার ট্রফি ওঠে আর্জেন্টিনার হাতে।

যে ফুটবলারকে একসময় জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থ বলা হতো, তিনিই কয়েক বছরের মধ্যে দেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়কে পরিণত হন।

মেসির অবসরের ঘোষণার সময় আর্জেন্টিনার বর্তমান মিডফিল্ড তারকা এনজো ফার্নান্দেজ ছিলেন মাত্র ১৫ বছরের কিশোর। তখনও তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিচিত মুখ নন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, “অনুগ্রহ করে চলে যেও না, লিও। তোমাকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখতে পারা আমাদের জন্য গর্বের। আমাদের ক্ষমা করে দিও।”

সেই কিশোরই আজ আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডের অন্যতম ভরসা। বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স দলকে নতুন শক্তি দিয়েছে। সময়ের এই পরিবর্তন ফুটবলের সৌন্দর্যকেই নতুন করে তুলে ধরে।

মেটলাইফ স্টেডিয়াম মেসির জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিগুলোর একটি বহন করে। এখানেই তিনি চোখের জল ফেলেছিলেন, এখানেই বিদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

কিন্তু খেলাধুলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যই হলো, এটি সবসময় নতুন সুযোগ এনে দেয়। একসময় যে মাঠ হতাশার প্রতীক ছিল, আজ সেটিই হতে পারে নতুন গৌরবের মঞ্চ।

আরও পড়ুন :  এআই কি চাকরির সবচেয়ে বড় শত্রু? ১ লক্ষ ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর সত্য!

যদি আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপ জিতে, তবে মেটলাইফ স্টেডিয়াম শুধুই ২০১৬ সালের বেদনার স্মৃতি বহন করবে না; বরং এটি হয়ে উঠবে প্রত্যাবর্তন, অধ্যবসায় এবং অসমাপ্ত গল্পের সফল সমাপ্তির প্রতীক।

টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ খুব কম ফুটবলারের ভাগ্যে আসে। মেসির জন্য এটি শুধু আরেকটি ফাইনাল নয়, বরং অতীতের ক্ষতকে পুরোপুরি মুছে ফেলার সুযোগ।

এক দশক আগে যে মাঠ তাঁকে কান্নায় ভাসিয়েছিল, আজ সেই একই মাঠে আবারও কোটি সমর্থকের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। ফুটবলের ইতিহাসে এমন নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প খুব কমই দেখা যায়।

লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার প্রমাণ করে, ব্যর্থতা কখনও শেষ কথা নয়। ২০১৬ সালের হতাশা, অবসর, সমালোচনা এবং অসংখ্য প্রশ্নের জবাব তিনি দিয়েছেন নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই। এরপর কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ এবং একের পর এক আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে তিনি নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

এখন সব চোখ আবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামের দিকে। যেখানে একদিন শেষের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি, সেখানেই কি লেখা হবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়? ফুটবলপ্রেমীরা সেই উত্তর জানার অপেক্ষাতেই আছেন।