ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম এবং সরবরাহব্যবস্থা সরাসরি প্রভাবিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প কিছু পাইপলাইন ও রপ্তানি রুট থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলোর কোনোটিই হরমুজ প্রণালির পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারবে না।
ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান জ্বালানি রপ্তানি করিডোর।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এটি বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এর প্রায় ৮০ শতাংশ যায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
শুধু তেল নয়, বিশ্বের মোট এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশও এই পথ ব্যবহার করে। বিশেষ করে কাতারের জন্য হরমুজ কার্যত একমাত্র বড় রপ্তানি করিডোর।
হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে উপসাগরীয় দেশগুলো গত কয়েক দশকে বেশ কিছু পাইপলাইন নির্মাণ করেছে।
সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় বিকল্প হলো ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন (পেট্রোলাইন)। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বর্তমানে এটি দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে সক্ষম।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন (এডকপ) হাবশান তেলক্ষেত্র থেকে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দরে তেল পৌঁছে দেয়। ফলে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেও রপ্তানি সম্ভব হয়।
ফুজাইরাহ বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়াতে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও চলছে।
ইরানও নিজস্ব বিকল্প হিসেবে গোরেহ-জাস্ক পাইপলাইন তৈরি করেছে। প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের পরিকল্পনা থাকলেও নিষেধাজ্ঞা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না।
সমস্যা হলো সক্ষমতা।
আইইএর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যমান বিকল্প পাইপলাইনগুলো মিলিয়েও দৈনিক মাত্র ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল অন্য পথে সরানো সম্ভব।
অথচ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন যায় প্রায় দুই কোটি ব্যারেল।
অর্থাৎ বিকল্প ব্যবস্থাগুলো হরমুজের মোট পরিবহন সক্ষমতার খুব সামান্য অংশই প্রতিস্থাপন করতে পারে।
ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে মধ্যপ্রাচ্যে আরও কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে।
এর মধ্যে রয়েছে, কিরকুক-জেইহান পাইপলাইন, কিরকুক-বানিয়াস পাইপলাইন পুনরুজ্জীবন,বসরা-আকাবা পাইপলাইন,ফোর সিজ প্রজেক্ট,কাতার-তুরস্ক গ্যাস পাইপলাইন।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় জ্বালানি রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আসতে পারে।
তবে অধিকাংশ প্রকল্পই এখনো পরিকল্পনা, পুনর্নির্মাণ অথবা সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
বিকল্প রুট থাকলেও নতুন সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরাক, সিরিয়া কিংবা তুরস্ক হয়ে যাওয়া পাইপলাইনগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা এবং অবকাঠামোর নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুথি হামলার ঘটনাগুলোও দেখিয়েছে, সুয়েজ করিডোর ও সুমেদ পাইপলাইনও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো অবশ্যই ভবিষ্যতে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করবে। এজন্য নতুন পাইপলাইন, নতুন বন্দর এবং বিকল্প রপ্তানি করিডোরে বিনিয়োগও বাড়বে।
তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান অবকাঠামো, পরিবহন সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক চাহিদার বিবেচনায় হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ বিকল্প এখনো নেই।
অর্থাৎ বিকল্প রুটগুলো কিছুটা চাপ কমাতে পারলেও, স্বল্পমেয়াদে কিংবা মধ্যমেয়াদে হরমুজের ভূমিকা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।

