ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল মেসির নাম আজ আর্জেন্টিনার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। নীল-সাদা জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ জেতা, কোপা আমেরিকা জয় কিংবা অসংখ্য অবিস্মরণীয় মুহূর্ত—সবই যেন আর্জেন্টিনার রঙে রাঙানো। কিন্তু ইতিহাস অন্য পথেও যেতে পারত। এমন এক সময় ছিল, যখন মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার স্পেনের লাল জার্সিতে শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল সবচেয়ে বেশি।
আজ সেই অবিশ্বাস্য গল্পই ফুটবলপ্রেমীদের নতুন করে ভাবায়। মাত্র একটি ভিডিও ক্যাসেট, কয়েকজন দূরদর্শী মানুষের উদ্যোগ এবং সময়মতো নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত বদলে দেয় বিশ্ব ফুটবলের গতিপথ।
ভাবুন, বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও স্পেন। একদিকে লিওনেল স্কালোনির দল, অন্যদিকে স্পেনের তারকাখচিত স্কোয়াড। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমক—স্পেনের জার্সিতে মাঠে নামছেন লিওনেল মেসি। নিজের জন্মভূমি আর্জেন্টিনার বিপক্ষেই খেলছেন তিনি।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, একসময় এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে বার্সেলোনায় পাড়ি জমান মেসি। সেখানেই তিনি যোগ দেন বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে।
স্পেনে দীর্ঘদিন থাকার ফলে দেশটির হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক দলের নির্বাচকদের নজর তখনও পড়েনি এই বিস্ময় বালকের ওপর।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই লা মাসিয়ায় নিজের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেন মেসি। কোচ, সতীর্থ এবং স্কাউট—সবাই বুঝতে শুরু করেছিলেন, এই ছেলেটির ভবিষ্যৎ অসাধারণ হতে চলেছে।
২০০২ সালের দিকে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। তখন ১৫ বছর বয়সী মেসি লা মাসিয়ার অন্যতম সেরা প্রতিভা। তাঁর সতীর্থ জেরার্ড পিকে, সেস ফ্যাব্রেগাসদের মতো অনেকেই স্পেনের বয়সভিত্তিক দলে ডাক পাচ্ছিলেন।
কিন্তু মেসির জন্য না আর্জেন্টিনা, না স্পেন—কোনও দেশের পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিক ডাক আসছিল।
এই অবস্থায় লা মাসিয়ার কোচ অ্যালেক্স গার্সিয়া উদ্যোগী হন। তিনি স্পেনের যুব দলের তৎকালীন পরিচালক গিনেস মেলেন্দেজের সঙ্গে যোগাযোগ করে মেসির প্রতিভার কথা জানান। গার্সিয়ার বিশ্বাস ছিল, আর্জেন্টিনা যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে স্পেন সহজেই মেসিকে নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
মেলেন্দেজ পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝলেও বিষয়টি নিয়ে মজার ছলে একটি মন্তব্য করেছিলেন, যা পরে ব্যাপক আলোচিত হয়।
তিনি বলেছিলেন, আর্জেন্টিনা যেন মেসিকে খুঁজে না পায়, সে জন্য ‘অপহরণ’ করাই ভালো! অবশ্য এটি ছিল নিছক হাস্যরসের মন্তব্য। কিন্তু কথাটি বুঝিয়ে দিয়েছিল, স্পেন কতটা আগ্রহী ছিল কিশোর মেসিকে নিজেদের জাতীয় দলে দেখতে।
এদিকে আর্জেন্টিনা থেকে কোনও খবর না আসায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মেসির বাবা হোর্হে মেসি।
তিনি যোগাযোগ করেন পারিবারিক এজেন্ট হোরাসিও গাজ্জিওলির সঙ্গে। লক্ষ্য ছিল একটাই—যেভাবেই হোক আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্তাদের নজরে আনতে হবে মেসিকে।
গাজ্জিওলি তখন একটি অভিনব পরিকল্পনা করেন। তিনি মেসির লা মাসিয়ায় খেলার অসাধারণ সব মুহূর্ত নিয়ে একটি ভিডিও ক্যাসেট তৈরি করেন।
সেই সময় ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ ছিল না। ফলে কোনও খেলোয়াড়ের প্রতিভা তুলে ধরতে ভিডিও ক্যাসেটই ছিল সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
সেই সময় আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কোচ ছিলেন মার্সেলো বিয়েলসা। এক সফরে তিনি বার্সেলোনায় গেলে গাজ্জিওলি তাঁর হাতে ভিডিও ক্যাসেটটি তুলে দেন।
ভিডিও দেখতে গিয়ে বিয়েলসা প্রথমে ভেবেছিলেন ফুটেজটি হয়তো দ্রুতগতিতে চালানো হচ্ছে। তিনি স্বাভাবিক গতিতে ভিডিও চালাতে বলেন।
তখন গাজ্জিওলি জানান, সেটিই আসলে মেসির স্বাভাবিক গতি।
মেসির ড্রিবলিং, গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা দেখে বিয়েলসা বিস্মিত হয়ে যান। তিনি বুঝে যান, এই প্রতিভাকে হারানো মানে ভবিষ্যতের এক মহাতারকাকে হারানো।
সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। তখন আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের দল ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। ফলে মেসিকে সেই দলে নেওয়ার সুযোগ আর ছিল না।
কাকতালীয়ভাবে সেই প্রতিযোগিতায় স্পেনের কাছেই পরাজিত হয়েছিল আর্জেন্টিনা।
এই ব্যর্থতার পর অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ হুগো তোকাল্লি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন—যেভাবেই হোক মেসিকে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলাতে হবে।
তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় কোনও দেশের হয়ে আনুষ্ঠানিক ম্যাচ খেললে পরে অন্য দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব ছিল না।
তাই সময় নষ্ট না করে দ্রুত একটি বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে ফিফার কাছে অনূর্ধ্ব-২০ দলে মেসির নাম পাঠানো হয়।
এরই মধ্যে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন জোসে পেকারম্যান। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মেসির মধ্যেই রয়েছে দিয়েগো মারাদোনার উত্তরসূরি হওয়ার সব গুণ।
২০০৪ সালের ২৯ জুন আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দল প্যারাগুয়েকে ৮-০ গোলে হারায়।
সেই ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন মেসি। অল্প সময় খেলেই করেন একটি গোল এবং সতীর্থকে দিয়ে করান আরেকটি গোল।
সেদিনই কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায় তাঁর আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ। এরপর আর স্পেনের হয়ে খেলার কোনও সম্ভাবনাই অবশিষ্ট থাকেনি।
ফুটবল ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় ‘হয়তো’-র গল্প।
২০১০ সালে স্পেন বিশ্বকাপ জেতে। এছাড়া ২০০৮ ও ২০১২ সালে টানা দুটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপও জেতে তারা। যদি মেসি সেই দলের অংশ হতেন, তাহলে তাঁর ট্রফির তালিকা আরও ভিন্ন হতে পারত।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০১৪ সালে ফাইনালে হারের হতাশা পেরিয়ে অবশেষে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেন মেসি।
ফুটবলে প্রতিভা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদি হোরাসিও গাজ্জিওলি সেই ভিডিও ক্যাসেট তৈরি না করতেন, যদি মার্সেলো বিয়েলসা সেটি না দেখতেন, কিংবা যদি আর্জেন্টিনা দ্রুত পদক্ষেপ না নিত—তাহলে হয়তো আজকের ফুটবল ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো।
আজ মেসির নাম উচ্চারণ করলেই সবার চোখে ভেসে ওঠে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, একসময় স্পেনও তাঁকে নিজেদের জাতীয় দলের মুখ বানানোর স্বপ্ন দেখেছিল। শেষ পর্যন্ত একটি ভিডিও ক্যাসেট, কয়েকজন দূরদর্শী মানুষের উদ্যোগ এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে যে, ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি নিজের মাতৃভূমি আর্জেন্টিনার হয়েই ইতিহাস লিখবেন।

