ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন একটি বিশেষ কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ইসরায়েলে। প্রস্তাবিত এই কারাগারের চারপাশে কুমিরে ভরা পরিখা রাখার ধারণা ইতোমধ্যেই দেশটির রাজনৈতিক, পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারের যুক্তি সামনে আনা হলেও সমালোচকদের মতে, এমন উদ্যোগ বাস্তবসম্মত নয় এবং এটি নৈতিক ও আইনি প্রশ্নও উত্থাপন করছে।
ইসরায়েলের পরিবেশ সুরক্ষামন্ত্রী ইদিত সিলমান নীল নদের কুমিরকে নতুন একটি আইনি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশেষ নিরাপত্তা প্রয়োজনে রাষ্ট্র কুমির নিজেদের হেফাজতে রাখার সুযোগ পেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই আইনি পরিবর্তনের লক্ষ্য ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কুমির ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত করা। যদিও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবুও এটি দেশটির বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির দক্ষিণাঞ্চলের কেতজিওত সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে প্রথম এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কারাগারটির চারপাশে কুমিরে ভরা পরিখা তৈরি করা হতে পারে, যাতে পালানোর সম্ভাবনা আরও কমে যায়। নিরাপত্তা জোরদারে এটি একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কারাগারের নকশা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অভিবাসন আটককেন্দ্র ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’-এর আদলে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কেন্দ্রটি জলাভূমি ও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহার করার ধারণার জন্য আলোচনায় এসেছিল। তবে পরিবেশগত উদ্বেগ ও আইনি জটিলতার কারণে পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই ঘটনাকে সামনে রেখে অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, একই ধরনের ধারণা অনুসরণ করলে ইসরায়েলও একই ধরনের আইনি ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
ইসরায়েলের নেচার অ্যান্ড পার্কস অথরিটি এই পরিকল্পনার সরাসরি বিরোধিতা করেছে।
সংস্থাটির মতে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কুমিরসহ বন্যপ্রাণী শুধুমাত্র শিক্ষা, গবেষণা এবং সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে রাখা যেতে পারে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এগুলো ব্যবহার করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
তাদের দাবি, কুমিরকে নিরাপত্তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে বিদ্যমান আইন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আইন উপদেষ্টা নেতা দ্রোরিও জানিয়েছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কুমির ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক বা বাস্তবভিত্তিক প্রমাণ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উন্নত প্রযুক্তি, নজরদারি ক্যামেরা, সেন্সর ও প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী অনেক বেশি কার্যকর। সেখানে কুমির ব্যবহার একটি প্রতীকী ধারণা হলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠন, প্রাণী অধিকার কর্মী এবং পরিবেশবিদরা একযোগে আপত্তি জানিয়েছেন।
তাদের বক্তব্য, বন্যপ্রাণীকে নিরাপত্তার সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করা প্রাণীর কল্যাণের পরিপন্থী। একই সঙ্গে এটি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সমালোচকদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এমন পদ্ধতির পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক ব্যবস্থা গ্রহণই অধিক গ্রহণযোগ্য।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কুমিরকে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ করলে পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কুমিরের আবাসন, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাকৃতিক আচরণ বজায় রাখা অত্যন্ত জটিল বিষয়। কৃত্রিম পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের রাখা প্রাণী কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকেও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
এ ছাড়া দুর্ঘটনাজনিত পালিয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা জননিরাপত্তার জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করবে।
বিশেষ করে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ঘিরে যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে থাকে। ফলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে ইসরায়েলকে দেশীয় আইন, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হতে পারে।

