বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন নতুন কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি প্রকাশ করা হতে পারে।
নতুন কমিটি ঘিরে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা দায়িত্ব পেতে পারেন, তা নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একাধিক দফায় আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম ধাপে কী শুধু শীর্ষ কয়েকটি পদ ঘোষণা করা হবে, নাকি একবারেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করা হবে।
দলীয় সূত্র বলছে, এবার নেতৃত্ব নির্বাচনে শুধু জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে না। বরং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, ত্যাগ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন একটি নেতৃত্ব গঠনের চেষ্টা চলছে, যারা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি তৃণমূল সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে পারবেন।
নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভারসাম্যও গুরুত্ব পাচ্ছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর এবং ময়মনসিংহ বিভাগের যোগ্য নেতাদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
একজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্বেচ্ছাসেবক দলকে আরও গতিশীল ও সংগঠিত করার লক্ষ্যেই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হচ্ছে। সেই লক্ষ্যে প্রার্থী যাচাই-বাছাই প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
নতুন কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা সামনে আসতেই বর্তমান ও সাবেক নেতাদের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীরা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
দলীয় সূত্রের দাবি, অনেকেই নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক অবদানের বিস্তারিত তথ্যও জমা দিয়েছেন।
তবে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা তদবিরের চেয়ে আন্দোলনে ভূমিকা, সাংগঠনিক অবদান, রাজনৈতিক মামলার মুখোমুখি হওয়া, কারাবরণ এবং নির্যাতনের মতো বিষয়গুলোই নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কমিটির সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অপেক্ষা করছে।
এর মধ্যে রয়েছে, সারাদেশে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তৃণমূল কমিটিগুলোর পুনর্গঠন সম্পন্ন করা।নতুন কর্মী তৈরি ও সাংগঠনিক সম্প্রসারণ।
নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করা। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে স্বেচ্ছাসেবক দল বিএনপির অন্যতম কার্যকর সহযোগী সংগঠন হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি আন্দোলনে সক্রিয় তরুণ নেতৃত্বকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে।
এতে একদিকে যেমন সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হবে।
একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, এমন একটি টিম গঠনের চেষ্টা চলছে, যারা বর্তমান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি আগামী দিনের নেতৃত্বও তৈরি করতে সক্ষম হবে। নতুন কমিটি ঘোষণার ধরন নিয়েও আলোচনা চলছে।
দলীয় একাধিক সূত্রের মতে, প্রথম ধাপে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র সহসভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সীমিত সংখ্যক পদ নিয়ে একটি ‘সুপার ফাইভ’ বা আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। পরে পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে আরেকটি সূত্রের দাবি, একবারেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার বিষয়েও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, সভাপতি পদে কয়েকজন অভিজ্ঞ নেতার নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আলোচনায় রয়েছেন , বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসিন আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন
এই তিনজনই দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে তাদের নাম আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
সাধারণ সম্পাদক পদেও কয়েকজন পরিচিত নেতার নাম ঘুরে ফিরে আসছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন, কাজী মোক্তার হোসেন, শেখ মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, জহির উদ্দিন তুহিন।
দলীয় সূত্রের দাবি, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ভিত্তিতেই তাদের নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমান কমিটির যুগ্ম সম্পাদক এবং ছাত্রদলের সাবেক নেতা কাজী মোক্তার হোসেন বলেন, খুব শিগগিরই নতুন কমিটি ঘোষণার বিষয়ে তিনি শুনেছেন। তবে দায়িত্ব কারা পাবেন, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, যাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাদের নেতৃত্বেই সংগঠন এগিয়ে যাবে এবং সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।
অন্যদিকে বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সম্প্রতি দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে বৈঠকে দ্রুত নতুন কমিটি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সভাপতি এস এম জিলানী দেশের বাইরে থাকায় ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসিন আলী, সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান এবং তিনি নিজে।
নাজমুল হাসানের ভাষ্য, কমিটি নিয়ে ব্যক্তিগত কোনো প্রত্যাশা নেই। দলের নেতৃত্ব যাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করবে, তাদের সঙ্গেই তিনি কাজ করবেন। আর দায়িত্ব পেলে আগের মতোই দলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯ আগস্ট ১৯৮০ সালে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্যোগ ও সংকটের সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে সংগঠনটি গড়ে তোলেন।
প্রথম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান সাংবাদিক কাজী সিরাজ। তার নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের প্রথম কমিটি গঠিত হয়।
পরবর্তীতে ১৯ আগস্ট ১৯৮৫ সালে কাজী আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে ২৯ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে।
বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রায় এক বছর অতিবাহিত হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নিয়ে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি এখন শুধু একটি সাংগঠনিক পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল ও সাংগঠনিক প্রস্তুতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দলীয় নেতাকর্মীরা আশা করছেন, অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে এমন একটি কমিটি গঠিত হবে, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এখন সবার দৃষ্টি নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকেই।

