খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeটকিং পয়েন্ট১২০০০ কিমি দূরের বিশ্বকাপ, তবু কেন রক্তাক্ত বাংলাদেশ? আসল কারণ জানুন

১২০০০ কিমি দূরের বিশ্বকাপ, তবু কেন রক্তাক্ত বাংলাদেশ? আসল কারণ জানুন

সমাধানটা খুব জটিল কিছু নয়। আমাদের শুধু মনে রাখতে হবে—খেলা মানে বিনোদন, জীবন নয়। প্রিয় দলকে ভালোবাসো, কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন কখনও মানুষের জীবনের চেয়ে বড় না হয়ে যায়।

ফুটবল এই একটা শব্দই যেন কোটি মানুষের আবেগ, আনন্দ আর পরিচয়ের অংশ। কিন্তু সেই ভালোবাসা যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন তা হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের ঠিক সেটাই মনে করিয়ে দেয়। প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু উত্তরটা কঠিন—১২ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি বিশ্বকাপ ম্যাচ কেন এখানে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়?

রাত গভীর। ঢাকার টিএসসি থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার অলিগলি সব জায়গায় একটাই দৃশ্য। প্রিয় দলের খেলা দেখতে মানুষের ঢল। কেউ গাছের ডালে বসে, কেউ বারান্দার রেলিং আঁকড়ে ঝুলে আছে। আবার কেউ বিশাল পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে। প্রথমবার দেখলে অবাক লাগে, দ্বিতীয়বারে ভালো লাগে। কিন্তু বারবার এই দৃশ্য দেখলে মনে প্রশ্ন জাগে এটা কি শুধুই ভালোবাসা, নাকি এর ভেতরে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে?

বাংলাদেশ কখনও ফুটবল বিশ্বকাপে খেলেনি। তবুও কেন বিদেশি দল নিয়ে এমন উন্মাদনা? কেন সেই উন্মাদনা কখনও কখনও সহিংসতায় রূপ নেয়?

অনেকের কাছে ফুটবল শুধু খেলা নয়, এটি নিজের পরিচয়ের অংশ। প্রিয় দল জিতলে মনে হয় নিজের জয়, আর হারলে নিজের পরাজয়। এই অনুভূতিটা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, কেউ সেই দলকে নিয়ে ঠাট্টা করলে তা ব্যক্তিগত অপমান বলে মনে হয়।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপের আগে বড় সমস্যা ব্রাজিলের! ওয়েসলির ইনজুরি, কী হবে এখন?

মনোবিজ্ঞানে এই বিষয়টিকে বলা হয় “আইডেন্টিটি ফিউশন” মানে নিজের সত্তার সঙ্গে দলের পরিচয় এক হয়ে যাওয়া। তখন আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের হার মানে নিজের হার। মেসি বা নেইমারকে অপমান করা মানে যেন নিজেকেই অপমান করা। এই জায়গা থেকেই শুরু হয় রাগ, তর্ক, এবং অনেক সময় মারামারি পর্যন্ত গড়ায়।

বাংলাদেশে এই প্রবণতা এখন আরও স্পষ্ট। একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, ভাঙচুর—এসব ঘটনা এখন আর বিরল নয়। টাঙ্গাইল ও যশোরের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, আহত হয়েছেন অনেকেই।

আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়। একটি চায়ের দোকানে খেলা নিয়ে কথা-কাটাকাটি থেকে শুরু হয়ে এক পর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। এতে প্রাণ হারান শরিফুল ইসলাম নামের একজন অটোরিকশাচালক। শুধু একটি ম্যাচ নিয়ে তর্ক এত বড় মূল্য!

বাংলাদেশের সমর্থনের পেছনে শুধু খেলাধুলার ভালোবাসা কাজ করে না। অনেক সময় ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মিলও প্রভাব ফেলে। যেমন, মিশর একটি মুসলিম-প্রধান দেশ হওয়ায় অনেকেই তাদের সমর্থন করেন। এতে সমস্যা নেই। সমস্যা তখনই হয়, যখন এই সমর্থন অন্ধ আবেগে পরিণত হয়।

তখন ফুটবল আর খেলা থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় ধর্ম, রাজনীতি, ব্যক্তিগত অহংকার। আর এই মিশ্রণই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপ জিততে পারবে ব্রাজিল? ১-১ ম্যাচে উঠে এলো কঠিন সত্য!

মানুষ স্বভাবতই দলবদ্ধ হয়ে থাকতে ভালোবাসে। ছোটবেলা থেকেই আমরা শিখি—‘আমরা’ আর ‘ওরা’। এই বিভাজনটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হয় যখন এই বিভাজন অতিরিক্ত হয়ে যায়।

বিশ্বকাপের সময় এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। তখন আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল শুধু খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তর্ক, কটূক্তি—সবকিছু মিলিয়ে একটা উত্তেজনা তৈরি হয়।

আগে যুদ্ধ হতো মাঠে, হাতে থাকত অস্ত্র। এখন যুদ্ধ হয় ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে। কিন্তু মানসিকতা খুব একটা বদলায়নি।

নেত্রকোনার দীপ্ত চৌধুরীর গল্পটা খুব কষ্টের। ২৩ বছরের এক কলেজ ছাত্র। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখে বাড়ি ফিরছিল। পথে একটি বিজয় মিছিল দেখে ছাদে উঠে ভিডিও করতে যায়। কিন্তু অসাবধানতাবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়।

ভাবতে পারো? একটা আনন্দের মুহূর্ত, একটা ভিডিও—আর তাতেই শেষ হয়ে গেল একটি জীবন। তার পরিবার আজও হয়তো সেই রাতের কথা ভুলতে পারেনি।

ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এর আসল শক্তি হলো মানুষকে এক করা। কিন্তু যদি এই খেলা আমাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে শত্রু বানিয়ে দেয়, তাহলে সমস্যা ফুটবলের নয় সমস্যা আমাদের ভেতরে।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপে রেফারি বিতর্ক! আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে কি শাস্তি আনছে ফিফা?

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে। পতাকা নামবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন বিষয় নিয়ে তর্ক শুরু হবে। কিন্তু যারা প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের জীবনে এই ক্ষতি কখনও পূরণ হবে না।

সমাধানটা খুব জটিল কিছু নয়। আমাদের শুধু মনে রাখতে হবে—খেলা মানে বিনোদন, জীবন নয়। প্রিয় দলকে ভালোবাসো, কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন কখনও মানুষের জীবনের চেয়ে বড় না হয়ে যায়।

ধরো, তুমি আর তোমার বন্ধু আলাদা দল সমর্থন করো। একটু খুনসুটি হলো, মজা হলো—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মজা যদি রাগে পরিণত হয়, তখনই থামতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত, একটা ম্যাচের চেয়ে বন্ধুত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা অবশ্যই সুন্দর। এটি আমাদের আনন্দ দেয়, একসঙ্গে হাসতে শেখায়। কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি সহিংসতা তৈরি করে, তাহলে সেটি আর সৌন্দর্য থাকে না।

মনে রাখতে হবে একটা গোল, একটা ম্যাচ, একটা ট্রফি এসব সাময়িক। কিন্তু একটি জীবন অমূল্য। তাই ভালোবাসো, উপভোগ করো, কিন্তু সীমার ভেতরে থাকো। কারণ খেলার আনন্দ তখনই সত্যিকারের, যখন সেটি কারও চোখের জল হয়ে ফিরে আসে না।

সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন।