মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজধানী তেহরানে এমন একটি বিশাল বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা প্যালেস্টাইন স্কয়ারে স্থাপিত ওই বিলবোর্ডে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পরিবারের সদস্যদের ছবি মার্কিন পতাকায় মোড়ানো কফিনের ওপর প্রদর্শন করা হয়েছে। পেছনের দৃশ্যে রাখা হয়েছে হোয়াইট হাউসের ছবি, যা পুরো বার্তাটিকে আরও প্রতীকী করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রচারণা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে, আর সেই প্রেক্ষাপটেই এই বিলবোর্ড আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
বিলবোর্ডে ব্যবহৃত সবচেয়ে আলোচিত বার্তা হলো ‘রক্তের বদলে রক্ত’। এই স্লোগানের মাধ্যমে সরাসরি প্রতিশোধের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। শুধু ট্রাম্প নন, তার পরিবারের সদস্যদের ছবিও সেখানে স্থান পাওয়ায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
ইরানের বিভিন্ন রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রচারণায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিশোধের ভাষা আরও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা নিহত হওয়ার ঘটনার পর দেশটির রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রতিশোধের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে।
এই বিলবোর্ডে ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প এবং তার পাঁচ সন্তান ইভাঙ্কা ট্রাম্প, ব্যারন ট্রাম্প, টিফানি ট্রাম্প, ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্পের ছবিও ব্যবহার করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এর মাধ্যমে একটি প্রতীকী বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির ভেতরে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার প্রতিশোধের ইঙ্গিত হিসেবেই ট্রাম্প পরিবারের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেহরানের প্যালেস্টাইন স্কয়ার বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে নিয়মিত বিভিন্ন ম্যুরাল, বিলবোর্ড ও রাজনৈতিক শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়।
ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে এই এলাকাকে প্রতীকী বার্তা প্রচারের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে ট্রাম্পকে ঘিরে এমন একটি বিলবোর্ড ঠিক এই স্থানেই স্থাপন করাকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্যালেস্টাইন স্কয়ারের বিলবোর্ডের পাশাপাশি তেহরানের এঙ্গেল্যাব স্কয়ারেও আরেকটি আলোচিত ম্যুরাল দেখা গেছে। সেখানে ট্রাম্পকে একটি খোলা কালো কফিনের ভেতরে চোখ বন্ধ অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখানো হয়েছে।
ছবিটির নিচে ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা রয়েছে, ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব।’ এই ধরনের বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ কোনো রাষ্ট্রের রাজধানীতে এমন প্রকাশ্য হুমকিমূলক প্রচারণা কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে।
তেহরানের রাস্তায় আরও একটি ম্যুরাল নজর কেড়েছে, যেখানে সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করা মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নাম উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, ‘পরবর্তী কে?’
এই বার্তাটিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকের মতে, এটি প্রতীকী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের কঠোর অবস্থান তুলে ধরার একটি প্রচারণামূলক কৌশল।
ইরানের সরকারি কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরেই সর্বোচ্চ নেতৃত্বের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করে আসছে। দেশটির বিভিন্ন সরকারি বক্তব্যে বারবার বলা হয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হবে না।
এদিকে খামেনির ছেলে এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচিত আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিও কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কেউই শান্তিপূর্ণ পরিণতি পাবে না। তার এই বক্তব্য ইরানের প্রতিশোধমূলক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর আগে ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য হামলা বা হত্যাচেষ্টার বিষয়ে প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ও ব্যাপক জবাব দেবে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও একাধিকবার জানানো হয়েছে, সাবেক ও বর্তমান মার্কিন নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা, রাজনৈতিক হুমকি এবং প্রচারণামূলক বার্তা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যযুদ্ধও এখন এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিলবোর্ড, ম্যুরাল এবং রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা উভয় পক্ষের কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ধরনের প্রকাশ্য হুমকিমূলক প্রচারণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে চলমান রাজনৈতিক মেরুকরণের সময় এমন বার্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রতীকী প্রচারণা বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর।
তথ্য সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

