বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর আবেগ, উত্তেজনা এবং ইতিহাস গড়ার অপেক্ষা। এমন একটি ম্যাচ পরিচালনার জন্য বিশ্বের অন্যতম অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য রেফারিকেই বেছে নেয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের বহুল প্রতীক্ষিত আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন ফাইনালের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে স্লোভেনিয়ার অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের হাতে।
মজার বিষয় হলো, কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে যে ম্যাচে লিওনেল মেসিদের অপ্রত্যাশিত হার দেখতে হয়েছিল, সেই ম্যাচও পরিচালনা করেছিলেন ভিনচিচ। এবার সেই রেফারিই থাকছেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের কেন্দ্রে।
ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ৪৬ বছর বয়সী স্লাভকো ভিনচিচ ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রধান রেফারির দায়িত্ব পালন করবেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক সফল পারফরম্যান্সের কারণেই তাঁকে এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিরপেক্ষ ও নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে ফিফা বরাবরই অভিজ্ঞ রেফারিদের ওপর ভরসা করে। ভিনচিচ সেই আস্থারই প্রতীক।
ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনায় ভিনচিচকে সহায়তা করবেন তাঁরই স্বদেশীয় দুই সহকারী রেফারি তোমাজ ক্লানচনিক এবং আন্দ্রাজ কোভিচিচ।
এছাড়া ম্যাচের চতুর্থ রেফারির দায়িত্ব পালন করবেন জর্ডানের আধহাম মাখাদমেহ। রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে থাকবেন কাতারের মোহাম্মদ আলকালাফ।
এভাবে ইউরোপ ও এশিয়ার অভিজ্ঞ ম্যাচ অফিসিয়ালদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে ফাইনালের রেফারিং দল।
ফিফার রেফারি কমিটির প্রধান এবং কিংবদন্তি সাবেক রেফারি পিয়েরলুইজি কলিনা ভিনচিচের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার জন্য স্লাভকো ভিনচিচই উপযুক্ত ব্যক্তি। ফাইনালে তিনি বিশেষ সোনালি ব্যাজযুক্ত রেফারি জার্সি পরবেন, যা ফিফার পক্ষ থেকে সম্মানসূচকভাবে প্রদান করা হয়।
কলিনার মতে, এই জার্সি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এটি একজন রেফারির দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম ও সাফল্যের স্বীকৃতি।
চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করেছেন স্লাভকো ভিনচিচ।
গ্রুপ পর্বে তিনি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন:
- ব্রাজিল বনাম মরক্কো
- জর্জিয়া বনাম আলজেরিয়া
এরপর নকআউট পর্বের রাউন্ড অব ৩২-এ মেক্সিকো বনাম ইকুয়েডরের ম্যাচেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এই তিনটি ম্যাচে তাঁর সিদ্ধান্ত, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ এবং VAR ব্যবহারের দক্ষতা ফিফার কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করেছে। সেই ধারাবাহিকতার পুরস্কার হিসেবেই এসেছে বিশ্বকাপ ফাইনালের দায়িত্ব।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও রেফারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন ভিনচিচ।
সেই আসরে তিনি দুটি ম্যাচ পরিচালনা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল আর্জেন্টিনা ও সৌদি আরবের মধ্যকার ম্যাচ।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। সেই অপ্রত্যাশিত পরাজয় ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল।
যদিও পরে অসাধারণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়ে আর্জেন্টিনা, তবুও সেই ম্যাচটি এখনও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান।
আর্জেন্টিনার ম্যাচ পরিচালনায় ভিনচিচ নতুন নন।
মেসিদের বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে দুই দলের খেলোয়াড়দের খেলার ধরন সম্পর্কে তাঁর ভালো ধারণা রয়েছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো উচ্চচাপের ম্যাচে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু আর্জেন্টিনা নয়, স্পেনের ম্যাচ পরিচালনার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে স্লাভকো ভিনচিচের।
২০১৭ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ দিয়ে স্পেনের ম্যাচ পরিচালনা শুরু করেন তিনি।
এরপর ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন—
- ইউরো ২০২০-এ স্পেন বনাম সুইডেন
- ২০২৩ উয়েফা নেশনস লিগ সেমিফাইনাল: স্পেন বনাম ইতালি
- ইউরো ২০২৪-এ ইতালি বনাম স্পেন
- ইউরো ২০২৪ সেমিফাইনাল: ফ্রান্স বনাম স্পেন
এসব বড় ম্যাচে তাঁর নির্ভুল সিদ্ধান্ত ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ প্রশংসিত হয়েছিল।
বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনার জন্য শুধু অভিজ্ঞতা নয়, প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা, নিরপেক্ষতা এবং কঠিন মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
স্লাভকো ভিনচিচ গত কয়েক বছরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, নেশনস লিগ এবং বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ধারাবাহিকভাবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন।
ফিফা মনে করছে, আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মতো দুই শক্তিশালী দলের মধ্যকার ফাইনালে তিনি সর্বোচ্চ মানের রেফারিং উপহার দিতে সক্ষম হবেন।
একদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা স্পেনও শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে।
দুই দলের শক্তি, কৌশল এবং তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াডের লড়াইয়ের পাশাপাশি নজর থাকবে ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের দিকেও।
কারণ বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ম্যাচে একটি সিদ্ধান্তও বদলে দিতে পারে পুরো ইতিহাস।
বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য স্লাভকো ভিনচিচকে বেছে নিয়ে অভিজ্ঞতার ওপরই আস্থা রেখেছে ফিফা। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ পরিচালনা করা এই স্লোভেনিয়ান রেফারি এবার ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচে বাঁশি বাজাবেন। তাঁর নিরপেক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং বড় ম্যাচ সামলানোর দক্ষতা আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, ইতিহাস গড়ার এই মহারণে ভিনচিচ কতটা সফলভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং শেষ পর্যন্ত কার হাতে ওঠে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি।

