Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeআবহাওয়া২০২৬ থেকে ২০৩০: ভয়ংকর তাপপ্রবাহে ফুটতে পারে পৃথিবী, ২০২৪-এর রেকর্ডও ভাঙার আশঙ্কা

২০২৬ থেকে ২০৩০: ভয়ংকর তাপপ্রবাহে ফুটতে পারে পৃথিবী, ২০২৪-এর রেকর্ডও ভাঙার আশঙ্কা

বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা এখন আর শুধু আবহাওয়ার খবর নয়, এটি ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে পৃথিবী দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এবার সেই আশঙ্কাই আরও স্পষ্ট করে সামনে আনল নতুন এক আন্তর্জাতিক রিপোর্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এমন এক ভয়ংকর গরমের মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব, যা ২০২৪ সালের রেকর্ড তাপমাত্রাকেও ছাপিয়ে যাবে।

গত কয়েক বছরে বিশ্বের নানা প্রান্তে যে তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছে, তা সাধারণ মানুষকে কার্যত হাঁসফাঁস পরিস্থিতিতে ফেলেছে। কোথাও দাবদাহে রাস্তায় মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কোথাও আবার জঙ্গলে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর গতিতে। এর মাঝেই বিশ্ব আবহাওয়া সংক্রান্ত সংস্থা নতুন সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, আগামী কয়েক বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

২০২৪ সালের রেকর্ড গরমও নাকি কিছুই নয়

২০২৪ সালকে এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম উষ্ণতম বছর হিসেবে ধরা হয়। ইউরোপ থেকে এশিয়া, আমেরিকা থেকে আফ্রিকা— প্রায় সব মহাদেশেই অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হয়েছে। অনেক দেশে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। শহরাঞ্চলে রাতের দিকেও গরম কমেনি, ফলে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

কিন্তু নতুন রিপোর্ট বলছে, এই রেকর্ডও হয়তো বেশিদিন টিকবে না। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত একটি বছর এমন হতে পারে, যখন পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২০২৪ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ বিশ্ব আরও ভয়ংকর গরমের সাক্ষী হতে চলেছে।

ওয়ার্ল্ড মেটিরিওলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের বড় সতর্কবার্তা

আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিরিওলজিক্যাল অর্গানাইজেশন বা WMO-এর রিপোর্টে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে পৃথিবীর উষ্ণতা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছতে পারে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের গড় তাপমাত্রার তুলনায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কোনও একটি বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে পারে।

শুনতে হয়তো ১.৫ ডিগ্রি খুব বেশি মনে না হলেও, আবহাওয়াবিদদের কাছে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সীমা। কারণ এই সামান্য বৃদ্ধিই পৃথিবীর আবহাওয়ার ভারসাম্যকে ভয়ংকরভাবে বদলে দিতে পারে।

কেন এত বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা?

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মূল কারণ মানুষের তৈরি দূষণ। কারখানা, যানবাহন, কয়লা ও পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস দ্রুত বাড়ছে। এই গ্যাসগুলো পৃথিবীর চারপাশে এক ধরনের তাপের চাদর তৈরি করছে, যার ফলে সূর্যের তাপ আটকে যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি বনভূমি ধ্বংস, অতিরিক্ত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের লাগামছাড়া ব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে প্রতি বছরই গড় তাপমাত্রা একটু একটু করে বাড়ছে।

এল নিনো ফেরায় বাড়বে বিপদ

বিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৬ সালে আবার সক্রিয় হতে পারে এল নিনো। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের জলতাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া, যা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে।

এল নিনো সক্রিয় হলে সাধারণত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে গরম আরও বেড়ে যায়। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যায়। কোথাও ভয়াবহ খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০২৬ সালে শুরু হওয়া এল নিনোর প্রভাব ২০২৭ সালেও বজায় থাকতে পারে। আর সেই কারণেই ২০২৭ সালকে সবচেয়ে ভয়ংকর গরমের বছরগুলির একটি বলে মনে করছেন অনেকে।

১.৫ ডিগ্রি উষ্ণতা বৃদ্ধির মানে কী?

অনেকেই ভাবতে পারেন, ১.৫ ডিগ্রি বাড়লে এমন কী সমস্যা হবে! কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সীমা অতিক্রম করলে বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও বেড়ে যাবে।

যেমন—

গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হবে।
ঘূর্ণিঝড় ও ঝড়ের শক্তি বাড়বে।
বরফ গলতে শুরু করবে দ্রুত গতিতে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে।
খরা ও জলসংকট ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রে বড় ক্ষতি হতে পারে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মানুষের জীবন, খাদ্য উৎপাদন এবং অর্থনীতির উপর।

মানুষ ও প্রাণীকুলের সামনে বড় সংকট

অতিরিক্ত গরম শুধু অস্বস্তির কারণ নয়, এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে। প্রবল তাপপ্রবাহে বৃদ্ধ, শিশু এবং অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড গরমে থাকলে হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়তে পারে।

শুধু মানুষ নয়, প্রাণীকুলও বড় বিপদের মুখে পড়তে পারে। অনেক প্রাণী ও পাখির প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। জলের অভাবে বন্যপ্রাণীর মৃত্যু বাড়তে পারে। সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সামুদ্রিক প্রাণীর জীবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে ভয়াবহ প্রভাব

গরম বাড়লে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে পারে কৃষিক্ষেত্র। অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। ধান, গম, ভুট্টা সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফসল ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। অনেক গরিব দেশে খাদ্যসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এখনই পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর

বিজ্ঞানীরা বারবার বলছেন, এখনও সময় পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। যদি এখন থেকেই দূষণ কমানো যায়, নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো যায় এবং বনভূমি রক্ষা করা যায়, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

অনেক দেশ ইতিমধ্যেই সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির দিকে ঝুঁকছে। তবে শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। বিদ্যুতের অপচয় কমানো, গাছ লাগানো এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

আগামী কয়েক বছর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে চলেছে। এই সময়ের মধ্যে যদি গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে আগামী প্রজন্মকে আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।

পৃথিবীর আবহাওয়া যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তা এখন আর কোনও ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বাস্তব। আর সেই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে আগামী কয়েক বছরের ভয়াবহ গরম।