দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট একটি দ্বীপপুঞ্জ, কিন্তু তার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশাল। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা আর্জেন্টিনায় ‘ইসলাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত, বহু দশক ধরে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে তীব্র বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ঘিরে দুই দেশের উত্তেজনা আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। রাজনৈতিক বক্তব্য, পুরনো যুদ্ধের স্মৃতি এবং ফুটবলের আবেগ—সব মিলিয়ে ফকল্যান্ড ইস্যু আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি আর্জেন্টিনার বিদেশমন্ত্রী পাবলো কুইর্নো দাবি করেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ঐতিহাসিকভাবে আর্জেন্টিনার ভূখণ্ড। তাঁর অভিযোগ, ব্রিটেন দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে এই দ্বীপপুঞ্জ দখল করে রেখেছে এবং সেখানে জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে বসতি স্থাপন করছে।
তিনি আরও বলেন, ব্রিটেনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কোনও গণভোট আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বৈধ হতে পারে না। তাঁর মতে, ফকল্যান্ড প্রশ্নের একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান হলো আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা এবং পারস্পরিক সমঝোতা।
এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই ব্রিটেন দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়ে দিয়েছে, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে তাদের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন হয়নি। লন্ডনের দাবি, দ্বীপপুঞ্জ বর্তমানে ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনেই রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সেই অবস্থান বজায় থাকবে।
ব্রিটেন ২০১৩ সালের গণভোটের কথাও উল্লেখ করেছে। সেই গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দা ব্রিটেনের সঙ্গে থাকার পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য, ফকল্যান্ডের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই তাদের নীতির ভিত্তি এবং সেই সিদ্ধান্তকে তারা সম্মান জানিয়ে যাবে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত। এটি আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে। ভৌগোলিকভাবে আর্জেন্টিনার কাছাকাছি হলেও ১৮৩৩ সাল থেকে দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বর্তমানে এটি একটি স্বশাসিত ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি। দ্বীপপুঞ্জের নিজস্ব প্রশাসন থাকলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ব্রিটেন পরিচালনা করে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই এই অঞ্চলকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে।
ফকল্যান্ড বিরোধের মূল কারণ ইতিহাস, ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত গুরুত্ব। আর্জেন্টিনার মতে, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিক অধিকারের ভিত্তিতে দ্বীপপুঞ্জ তাদেরই হওয়া উচিত।
অন্যদিকে ব্রিটেনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছে এবং দ্বীপবাসীরাই ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকতে চান। ফলে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থেকেই যাচ্ছে।
ফকল্যান্ড বিরোধ সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় ১৯৮২ সালে।
সে সময় আর্জেন্টিনার সামরিক শাসক লিওপোল্ড গালতিয়েরির নির্দেশে আর্জেন্টাইন বাহিনী ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। এই পদক্ষেপের জবাবে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দ্রুত যুদ্ধজাহাজ, বিমান এবং সেনা দক্ষিণ আটলান্টিকে পাঠান।
দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় টানা ৭৪ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং ফকল্যান্ড আবারও ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যায়।
এই যুদ্ধে প্রায় ৬৫০ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা প্রাণ হারান। যুদ্ধটি দুই দেশের জাতীয় ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং আজও সেই স্মৃতি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসে।
বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়, অনেক সময় জাতীয় পরিচয়, আবেগ এবং ইতিহাসেরও প্রতীক হয়ে ওঠে।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড বা ব্রিটেনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট। ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর দুই দেশের জনগণের মধ্যে যে আবেগ তৈরি হয়েছিল, তা ফুটবল মাঠেও প্রতিফলিত হয়েছে।
সেই কারণেই বিশ্বকাপে এই দুই দেশের মুখোমুখি হওয়া মানেই পুরনো ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল।
সেই ম্যাচ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় লড়াই হিসেবে পরিচিত।
প্রথম গোলটি আসে দিয়াগো মারাদোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে। রেফারির চোখ এড়িয়ে হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়েছিলেন তিনি।
এরপর আসে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল। নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোল করেন মারাদোনা। এই গোলকে আজও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বলা হয়।
আর্জেন্টিনার অনেক সমর্থকের কাছে সেই জয় ছিল শুধুমাত্র একটি ফুটবল ম্যাচের সাফল্য নয়, বরং ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর এক ধরনের মানসিক প্রতিশোধ।
বর্তমান বিশ্বকাপে আবারও আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সম্ভাব্য লড়াই ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তার আগেই ফকল্যান্ড ইস্যুতে দুই দেশের কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
একদিকে আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে তাদের পুরনো দাবি পুনর্ব্যক্ত করছে। অন্যদিকে ব্রিটেন জানিয়ে দিয়েছে, ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীপবাসীর সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফকল্যান্ড ইস্যুর দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা খুবই কম। আর্জেন্টিনা আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ব্রিটেন দ্বীপবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সামনে রেখে তাদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।
ফলে এই বিরোধ আগামী দিনেও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি এবং বিশ্ব ফুটবলের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ড নয়; এটি ইতিহাস, জাতীয় গর্ব, কূটনীতি এবং আবেগের প্রতীক। ১৯৮২ সালের যুদ্ধের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। সেই কারণেই বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে।
রাজনৈতিক বিরোধ এবং ফুটবলের আবেগ যখন একই সুতোয় গাঁথা হয়, তখন ফকল্যান্ড প্রশ্ন কেবল কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে থাকে না; এটি দুই দেশের জাতীয় পরিচয় ও ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়।

