ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)-এর ইতিহাসে সবচেয়ে সফল কোচদের একজন স্টিফেন ফ্লেমিং। প্রায় দুই দশকের কাছাকাছি সময় ধরে চেন্নাই সুপার কিংস (সিএসকে)-এর সাফল্যের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। অবশেষে সেই দীর্ঘ ও গৌরবময় সম্পর্কের ইতি ঘটল। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সিএসকের প্রধান কোচের দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক।
সোমবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে চেন্নাই সুপার কিংস। এই ঘোষণার পর থেকেই আইপিএল অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কারণ, ফ্লেমিং শুধু একজন কোচ ছিলেন না, তিনি ছিলেন সিএসকের পরিচয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০০৮ সালে আইপিএলের প্রথম আসর থেকেই চেন্নাই সুপার কিংসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্টিফেন ফ্লেমিং। এক বছর পর, ২০০৯ সালে তিনি দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেন। এরপর শুরু হয় সিএসকের সাফল্যের এক নতুন যুগ।
ফ্লেমিংয়ের নেতৃত্বে চেন্নাই সুপার কিংস আইপিএলের সবচেয়ে ধারাবাহিক ও সফল দলগুলোর একটিতে পরিণত হয়। তাঁর কৌশলী পরিকল্পনা, শান্ত নেতৃত্ব এবং খেলোয়াড়দের প্রতি আস্থাই দলটিকে বারবার সাফল্যের মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে।
স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের অধীনে চেন্নাই সুপার কিংস অর্জন করেছে একের পর এক ঐতিহাসিক সাফল্য।
তার কোচিংয়ে দলটি পাঁচবার আইপিএল শিরোপা জিতেছে। পাশাপাশি দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টি-টোয়েন্টি ট্রফিও নিজেদের করে নিয়েছে। শুধু ট্রফি নয়, ধারাবাহিক পারফরম্যান্সেও সিএসকে ছিল অনন্য।
ফ্লেমিংয়ের অধীনে দলটি ১২ বার প্লে-অফে জায়গা করে নেয় এবং ১০ বার ফাইনাল খেলে। আইপিএলের ইতিহাসে এতটা ধারাবাহিক সাফল্যের নজির খুব কম দলই গড়তে পেরেছে।
এমনকি যখন দুই মৌসুমের জন্য চেন্নাই সুপার কিংস নিষিদ্ধ ছিল, তখনও ফ্লেমিং ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রতি নিজের আনুগত্য বজায় রেখেছিলেন। সেই কারণেই সমর্থকদের কাছে তিনি শুধু কোচ নন, বরং পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠেছিলেন।
২০২৩ সালে শেষবার আইপিএলের প্লে-অফে খেলেছিল চেন্নাই সুপার কিংস। এরপর টানা তিনটি মৌসুমে দলটি পয়েন্ট তালিকার নিচের দিকে অবস্থান করে প্রতিযোগিতা শেষ করে।
এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর থেকেই কোচিং স্টাফে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষকের মতে, দলের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যদিও ফ্র্যাঞ্চাইজির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, এটি দুই পক্ষের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়েছে।
স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের বিদায় উপলক্ষে আবেগঘন বার্তা প্রকাশ করেছে চেন্নাই সুপার কিংস।
বিবৃতিতে ফ্র্যাঞ্চাইজি জানায়, দুই পক্ষের সম্মতিতেই স্টিফেন ফ্লেমিং ও সুপার কিংসের দীর্ঘ পথচলার সমাপ্তি ঘটেছে। একসঙ্গে তারা আইপিএলের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও স্মরণীয় অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। ফ্লেমিংয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও দলকে অনুপ্রাণিত করবে বলেও জানানো হয়। শেষে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি।
চেন্নাই সুপার কিংসকে বিদায় জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্টিফেন ফ্লেমিং।
তিনি বলেন, প্রায় ১৮ বছর একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাটানো সত্যিই অনেক বড় সময়। এই সময়ের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ এবং সিএসকের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোকে নিজের কোচিং জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা বলে উল্লেখ করেন।
ফ্লেমিং আরও বলেন, এই দীর্ঘ সময়ে দল অসংখ্য স্মরণীয় জয় উদযাপন করেছে, আবার কঠিন সময়ও একসঙ্গে মোকাবিলা করেছে। সেই সব মুহূর্ত তাঁর জীবনের অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতেও তিনি চেন্নাই সুপার কিংসের একজন সমর্থক হিসেবেই থাকবেন বলে জানান।
চেন্নাই সুপার কিংসের মালিক রূপা গুরুনাথও স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেন, ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রায় পুরো যাত্রাপথেই ফ্লেমিং কোচিং ইউনিটের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন। তাঁর নেতৃত্ব, নিষ্ঠা এবং দূরদর্শিতাই সিএসকের পরিচয় গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
রূপা গুরুনাথের মতে, আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের সমাপ্তি হলেও স্টিফেন ফ্লেমিং সবসময় সুপার কিংস পরিবারের অবিচ্ছেদ্য সদস্য হয়ে থাকবেন।
ফ্র্যাঞ্চাইজির ম্যানেজিং ডিরেক্টর কাশী বিশ্বনাথনও ফ্লেমিংয়ের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন।
তিনি বলেন, এত দীর্ঘ সময় একজন বিশ্বমানের কোচের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া সিএসকের জন্য গর্বের বিষয়। তাঁর নেতৃত্বে দল শুধু ট্রফিই জেতেনি, বরং একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি ও জয়ের মানসিকতাও গড়ে তুলেছে।
স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের বিদায়ের মাধ্যমে চেন্নাই সুপার কিংসের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। আগামী মৌসুমে নতুন কোচের অধীনে দল কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে, সেটাই এখন ক্রিকেটপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয়।
অন্যদিকে, ফ্লেমিংয়ের মতো অভিজ্ঞ কোচ ভবিষ্যতে অন্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি বা আন্তর্জাতিক দলের দায়িত্ব নেবেন কি না, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
একটি বিষয় অবশ্য নিশ্চিত—আইপিএলের ইতিহাসে স্টিফেন ফ্লেমিং এবং চেন্নাই সুপার কিংসের যুগলবন্দি সবসময়ই সাফল্য, ধারাবাহিকতা এবং পেশাদারিত্বের অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁদের যৌথ যাত্রা শেষ হলেও ক্রিকেট ইতিহাসে এই সম্পর্কের গুরুত্ব কখনও কমবে না।

