ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছেও ইংল্যান্ড শিবিরে এখন পুরোপুরি শান্ত পরিবেশ নেই। মাঠে দুর্দান্ত লড়াই করে নরওয়েকে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করলেও, ম্যাচ-পরবর্তী মন্তব্য ঘিরে কোচ থমাস টুখেল এবং তারকা মিডফিল্ডার জুড বেলিংহ্যামের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনালের আগে এই পরিস্থিতি ইংল্যান্ড সমর্থকদের কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
একদিকে কোচ দলের পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তুষ্ট, অন্যদিকে বেলিংহ্যাম মনে করছেন কঠিন পরিস্থিতিতে জয় পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। ফলে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আবেগ—সব মিলিয়ে এই ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা লড়াই মানেই বিশেষ আবহ। ১৯৮৬ সালের সেই বিতর্কিত ম্যাচ, দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো এখনও ইংলিশ ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে তাজা। এবার অবশ্য প্রতিশোধের পাশাপাশি আরও বড় লক্ষ্য বিশ্বকাপ জয়।
ইংল্যান্ডের বিশ্বাস, এবার তাদের হাতে এমন একটি দল রয়েছে যারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে সক্ষম। তবে সেই পথে সবচেয়ে বড় বাধা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং তাদের অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিরুদ্ধে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের শক্তিশালী শটে এগিয়ে যায় নরওয়ে। সেই সময় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্ন হয়তো আবারও থেমে যাবে।
কিন্তু এবারকার ইংল্যান্ড আগের মতো নয়। কোচ টুখেলের অধীনে দলটি কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা অর্জন করেছে।
প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে জুড বেলিংহ্যামের সমতাসূচক গোল ম্যাচে নতুন প্রাণ ফেরায়। দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ে আবারও জালে বল পাঠালেও, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) আগের ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত নাটকীয় লড়াই শেষে ইংল্যান্ড জয় নিশ্চিত করে এবং সেমিফাইনালে ওঠে।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিতে সক্ষম হয় ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ।
যে হালান্ড আগের ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি খুব বেশি সুযোগই পাননি। যদিও একবার বল জালে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু VAR-এর সিদ্ধান্তে সেই গোল বাতিল হয়।
এই পারফরম্যান্স ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী আক্রমণভাগের বিপক্ষে এটি ইতিবাচক বার্তা।
ম্যাচ শেষে নরওয়ে শিবিরে হতাশার পাশাপাশি ক্ষোভও দেখা যায়।
হালান্ডের বাতিল হওয়া গোল নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করেন তার বাবা। নরওয়ের দাবি, গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত কঠোর ছিল।
শুধু তাই নয়, বেলিংহ্যামের সমতাসূচক গোল নিয়েও আপত্তি তোলে নরওয়ে। তাদের অভিযোগ, আক্রমণ তৈরির সময় বল স্পাইডারক্যামের তারে লেগে দিক পরিবর্তন করেছিল।
যদিও ম্যাচ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ আমলে নেননি এবং ফলাফল অপরিবর্তিত থাকে।
জয়ের পরও সন্তুষ্ট নন ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই ধরনের পারফরম্যান্স নিয়ে আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয়।
তার ভাষায়, দলকে আরও দ্রুত, আরও সংগঠিত এবং আরও কার্যকর ফুটবল খেলতে হবে। শুধুমাত্র লড়াইয়ের মানসিকতা দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব নয়।
টুখেলের মতে, সেমিফাইনালে প্রতিটি ছোট ভুলই বড় মূল্য দিতে বাধ্য করবে।
কোচের মন্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন জুড বেলিংহ্যাম।
তার মতে, গরম আবহাওয়া, কঠিন প্রতিপক্ষ এবং ম্যাচের চাপের মধ্যে জয় তুলে আনা সহজ কাজ নয়।
বেলিংহ্যাম বলেন, সব ম্যাচে দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলে জিততে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেক সময় চরিত্র, মানসিক দৃঢ়তা এবং লড়াই করার ক্ষমতাই ম্যাচ জেতায়।
তিনি আরও বলেন, খেলোয়াড়দের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত এবং সমালোচনার পরিবর্তে তাদের কৃতিত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এই বিশ্বকাপে হ্যারি কেন এবং জুড বেলিংহ্যাম দুজনেই দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। দুজনেরই গোলসংখ্যা ছয়ে পৌঁছেছে।
তবে কোচ টুখেল বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিশ্বকাপ জিততে হলে পুরো দলকে সমানভাবে অবদান রাখতে হবে।
তিনি চান না ইংল্যান্ড শুধুমাত্র দুই তারকার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ুক। মিডফিল্ড, ডিফেন্স এবং বেঞ্চ থেকেও সমান অবদান আসতে হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই টুখেলের কোচিং দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বেলিংহ্যাম জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের কাছে এই ম্যাচ শুধুমাত্র একটি সেমিফাইনাল নয়।
তিনি মনে করেন, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটিকে ফাইনালের গুরুত্ব দিয়েই খেলতে হবে। কারণ এই ম্যাচ জিতলেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আরও একধাপ কাছে চলে আসবে।
ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা এখন মানসিক এবং কৌশলগত—দুই দিক থেকেই নিজেদের প্রস্তুত করছেন।
টুখেল ও বেলিংহ্যামের বক্তব্যে মতপার্থক্য থাকলেও, সেটি বড় কোনো দ্বন্দ্বে রূপ নেবে কি না, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।
ফুটবলে বড় টুর্নামেন্ট চলাকালীন কোচ ও খেলোয়াড়দের মধ্যে ভিন্ন মত থাকা অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় এই ধরনের আলোচনা দলকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
তবে বিশ্বকাপের মতো আসরে ছোট একটি ভুল বোঝাবুঝিও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ইংল্যান্ড সমর্থকদের আশা, সেমিফাইনালের আগে সব মতভেদ দূর করে দলটি ঐক্যবদ্ধভাবেই মাঠে নামবে।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু সেমিফাইনাল নয়, ইংল্যান্ডের জন্য এটি মানসিক দৃঢ়তা, কৌশল এবং দলীয় ঐক্যেরও পরীক্ষা।
মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ড্রেসিংরুমের পরিবেশও এই ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদি টুখেলের কৌশল, বেলিংহ্যামের নেতৃত্ব এবং হ্যারি কেনের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কার্যকর হয়, তাহলে বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইংল্যান্ড আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছাতে পারে। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে প্রথমেই টপকাতে হবে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার কঠিন বাধা।

