খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeঅর্থ-বানিজ্যআমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করেছে ভারত? বিতর্কের জবাবে মোদি সরকারের স্পষ্ট অবস্থান

আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করেছে ভারত? বিতর্কের জবাবে মোদি সরকারের স্পষ্ট অবস্থান

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভারত নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করেছে। এমন খবরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা আগের মতোই ইতিবাচকভাবে এগিয়ে চলছে এবং চুক্তি বাতিলের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় ভারত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্যচুক্তি এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। আরও দাবি করা হয়, ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কিছু শর্ত দিয়েছে এবং দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।

এই ধরনের তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কারণ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের খবর স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই গুঞ্জনের জবাবে দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার গত জুন মাসে দিল্লি সফর করেন এবং সেই সময় দুই পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

মন্ত্রী জানান, উভয় দেশই বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। তাঁর ভাষায়, এই চুক্তি হবে ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। এর মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক ও ভোক্তারা সরাসরি উপকৃত হবেন।

তিনি আরও বলেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে। চুক্তি বাতিলের খবর সম্পূর্ণ ভুয়ো, ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর।”

ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, কৃষি, ওষুধ, উৎপাদন শিল্প এবং ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একটি কার্যকর বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়িত হলে—

  • দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি আরও সহজ হবে।
  • ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
  • নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
  • কৃষি ও উৎপাদন খাতে নতুন বাজার উন্মুক্ত হবে।
  • আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দুই দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

এই কারণেই বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে যেকোনো খবর আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে উভয় দেশ পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা এবং লাভজনক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্যচুক্তির কাঠামো তৈরিতে সম্মত হয়।

এই ঘোষণার মাধ্যমে দুই দেশ স্পষ্ট বার্তা দেয় যে তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে চায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।

চুক্তির অগ্রগতি নিশ্চিত করতে ভারতের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল গত ২০ থেকে ২৩ এপ্রিল ওয়াশিংটন সফর করে। সেখানে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—

  • শুল্ক নীতি
  • কৃষিপণ্য বাণিজ্য
  • ডিজিটাল বাণিজ্য
  • বাজারে প্রবেশাধিকার
  • বিনিয়োগ সুরক্ষা
  • শিল্প সহযোগিতা

এই বৈঠককে উভয় পক্ষই ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করে এবং আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়।

ওয়াশিংটনের বৈঠকের ধারাবাহিকতায় গত মাসে মার্কিন প্রতিনিধি দল নয়াদিল্লি সফর করে। সেখানে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তির বিভিন্ন ধারা নিয়ে আরও গভীর আলোচনা করেন।

ভারত সরকার জানিয়েছে, আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি চুক্তি তৈরি করা, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের জন্য লাভজনক হবে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিভিন্ন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিও সেই ধরনের একটি উদাহরণ। সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে এমন তথ্য প্রচার করা হয়, যা পরে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে খণ্ডন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে তথ্য প্রকাশের আগে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্র যাচাই করা উচিত।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্লেষকদের ধারণা, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার ধারা অব্যাহত থাকবে। দুই দেশই এমন একটি বাণিজ্যচুক্তি চায়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায়িক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।

বিভিন্ন সূত্রের মতে, চলতি বছরের শেষের দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুর দিকে এই ইন্দো-মার্কিন অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে। যদিও চুক্তির নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি, তবে আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক বলেই সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করেছে—এমন দাবি সরকারিভাবে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ধরনের প্রতিবেদন ভুয়ো, ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং উভয় পক্ষই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক লাভজনক চুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুজবের পরিবর্তে সরকারি বিবৃতি ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।