Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeএক্সক্লুসিভভুল থেকে জন্ম নেওয়া বিস্ময়: যেভাবে জন ওয়াকারের হাত ধরে আধুনিক দেশলাই...

ভুল থেকে জন্ম নেওয়া বিস্ময়: যেভাবে জন ওয়াকারের হাত ধরে আধুনিক দেশলাই বদলে দিল পৃথিবী

আগুন আবিষ্কার মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের অন্যতম। কিন্তু সেই আগুন সহজে জ্বালানোর উপায় একসময় এতটাই কঠিন ছিল যে মানুষকে চকমকি পাথর, ইস্পাত কিংবা জ্বলন্ত কয়লার ওপর নির্ভর করতে হতো। তারপর হঠাৎই এক অসাবধানতাজনিত ঘটনা বদলে দেয় পুরো পৃথিবী। ভুল থেকেই জন্ম নেয় আধুনিক দেশলাইয়ের ধারণা, যা আজও মানুষের নিত্যদিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রায় ২০০ বছর আগে, ১৮২৬ সালে ইংল্যান্ডের এক ফার্মাসিস্ট জন ওয়াকার এমন এক আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে তোলে। মজার বিষয় হলো, তিনি পরিকল্পনা করে দেশলাই আবিষ্কার করেননি। বরং রাসায়নিক নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়েই দুর্ঘটনাবশত তিনি এমন এক জিনিস তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে আধুনিক দেশলাই হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

শিল্পবিপ্লবের সময়কার এক অসাধারণ আবিষ্কার

জন ওয়াকারের জন্ম ১৭৮১ সালে ইংল্যান্ডের ডারহামের স্টকটন-অন-টিস শহরে। তখন ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সময় চলছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন, রেলপথ এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছিল। জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন তখন শিল্পকারখানায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

১৮২৫ সালে স্টকটনে পৌঁছে যায় বিশ্বের প্রথম পাবলিক রেলওয়ে। এরপর জর্জ স্টিফেনসনের বিখ্যাত “রকেট” লোকোমোটিভ প্রমাণ করে যে ট্রেন ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। ফলে যাত্রাপথ ছোট হয়ে আসে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বাড়ে এবং শিল্পক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে।

তবে এত উন্নতির মাঝেও আগুন জ্বালানোর সহজ কোনো পদ্ধতি তখনো ছিল না। রান্না, আলো কিংবা কারখানার কাজে আগুন জ্বালাতে মানুষকে প্রচুর ঝামেলা পোহাতে হতো। এই সমস্যার সমাধানই একসময় এনে দেন জন ওয়াকার।

কীভাবে দুর্ঘটনা থেকে দেশলাইয়ের জন্ম?

জন ওয়াকার মূলত একজন প্রশিক্ষিত সার্জন ছিলেন। কিন্তু অপারেশন থিয়েটারের রক্তাক্ত পরিবেশ তার ভালো লাগত না। তাই পরে তিনি ফার্মাসিস্ট বা “ড্রাগিস্ট” হিসেবে কাজ শুরু করেন। মানুষ ছাড়াও ঘোড়া, গরু এবং মুরগির জন্য ওষুধ তৈরি করতেন তিনি।

এর পাশাপাশি রাসায়নিক নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল তার শখ। একদিন বিস্ফোরক তৈরির জন্য তিনি কয়েকটি রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করছিলেন। সেই মিশ্রণে ভেজানো কাঠির মাথা শুকিয়ে গেলে ভুলবশত তা চুল্লির পাশে থাকা পাথরে আঘাত লাগে। আর তখনই হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে।

এই ঘটনাই ছিল আধুনিক ফ্রিকশন ম্যাচ বা ঘষে জ্বালানো দেশলাইয়ের সূচনা।

ওয়াকার দ্রুত বুঝতে পারেন, এটি শুধু মজার কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিপ্লব আনার মতো একটি আবিষ্কার।

প্রথম দেশলাই কেমন ছিল?

জন ওয়াকার তার নতুন আবিষ্কারের নাম দেন “ফ্রিকশন ম্যাচেস”। এগুলো খুব পাতলা কাঠির তৈরি ছিল। কাঠির মাথায় থাকত পটাশিয়াম ক্লোরেট, অ্যান্টিমনি সালফাইড, গাম অ্যারাবিক এবং পানির বিশেষ মিশ্রণ।

এই কাঠিগুলোকে শিরিষ-কাগজ বা স্যান্ডপেপারের সঙ্গে ঘষলেই সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বলে উঠত। তখনকার সময়ের জন্য এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি।

১৮২৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো ওয়াকার তার দেশলাই বাজারে বিক্রি শুরু করেন। দেশলাইগুলো টিনের কৌটায় ভরে বিক্রি করা হতো এবং দ্রুতই মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

কেন জন ওয়াকার ইতিহাসে পিছিয়ে গেলেন?

অবাক করার মতো বিষয় হলো, জন ওয়াকার কখনো তার আবিষ্কারের পেটেন্ট করেননি। তিনি নিজের আবিষ্কার গোপন রাখলেও সেটিকে বড় ব্যবসায় রূপ দিতে চাননি।

এই সুযোগ কাজে লাগান লন্ডনের স্যামুয়েল জোন্স। ১৮২৯ সালে তিনি “লুসিফার” নামে দেশলাই বাজারে আনেন, যা মূলত ওয়াকারের আবিষ্কারের অনুকরণ ছিল। এরপর থেকেই দেশলাইয়ের ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়।

অন্যান্য উদ্ভাবকও দেশলাইয়ের নকশা ও রাসায়নিক উপাদান আরও উন্নত করতে থাকেন। ধীরে ধীরে আধুনিক দেশলাই বাক্সের ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৮৪৪ সালে সুইডেনে তৈরি নতুন ধরনের দেশলাই বাক্স মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

দেশলাই শিল্পের উত্থান

দেশলাই আবিষ্কারের পর এটি দ্রুত একটি বড় শিল্পে পরিণত হয়। অনেক এলাকায় পরিবারভিত্তিকভাবে দেশলাই তৈরি শুরু হয়। নারী ও শিশুরাও ঘরে বসে বাক্স তৈরির কাজে যুক্ত হয়।

তখনকার দিনে এটি ছিল অনেক পরিবারের অতিরিক্ত আয়ের উৎস। পরে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশলাই শিল্প বহু-মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হয়।

বিশ্বজুড়ে রান্নাঘর, কারখানা, রেললাইন, দোকান এবং ঘরোয়া কাজে দেশলাই অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মানুষের হাতে আগুন পৌঁছে যায় খুব সহজ ও সাশ্রয়ীভাবে।

দেশলাইয়ের দুর্বলতা ও নতুন প্রতিযোগিতা

প্রথম দিকের দেশলাই পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। জ্বলন্ত সালফারের অংশ অনেক সময় কাঠি থেকে পড়ে যেত, ফলে পোশাক কিংবা মেঝেতে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকত।

পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা আরও নিরাপদ উপাদান ব্যবহার করে দেশলাই উন্নত করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিগারেট লাইটার বাজারে আসায় দেশলাই শিল্পে কিছুটা ধাক্কা লাগে।

তবুও দেশলাইয়ের প্রয়োজন কখনো শেষ হয়নি। কারণ এটি সহজ, সস্তা এবং বহনযোগ্য। আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন দেশলাই ব্যবহার করে।

আধুনিক সময়ে দেশলাইয়ের নতুন পরিচয়

বর্তমানে দেশলাই শুধু প্রয়োজনীয় পণ্য নয়, অনেক জায়গায় এটি ফ্যাশন ও সংগ্রহের জিনিস হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, হোটেল এবং ব্র্যান্ড নিজেদের লোগোসহ কাস্টম দেশলাই তৈরি করছে।

বিশেষ ডিজাইনের কিছু দেশলাই প্যাকের দাম কয়েকশ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলে সাধারণ একটি জিনিসও এখন স্টাইলের অংশ হয়ে উঠেছে।

জন ওয়াকারের প্রাপ্য সম্মান

যদিও দেশলাই পৃথিবী বদলে দিয়েছে, এর আবিষ্কারক জন ওয়াকার তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। ইতিহাসে অনেক বড় আবিষ্কারকের নাম মানুষের মুখে মুখে থাকলেও ওয়াকার দীর্ঘদিন আড়ালেই থেকে গেছেন।

তবে বর্তমানে ইংল্যান্ডের স্টকটন শহরের মানুষ তার অবদান নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তার জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে, যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে কীভাবে একটি ছোট্ট দুর্ঘটনা বিশ্বকে বদলে দিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জন ওয়াকারের আবিষ্কার শুধু আগুন জ্বালানোর পদ্ধতি বদলায়নি, বরং শিল্প, পরিবহন এবং গৃহস্থালির কাজেও গতি এনে দিয়েছে।

একটি ছোট কাঠির মাথায় জ্বলে ওঠা সেই স্ফুলিঙ্গ আজও মানবসভ্যতার অগ্রগতির প্রতীক হয়ে আছে। আর সেই কারণেই আধুনিক দেশলাইয়ের ইতিহাসে জন ওয়াকারের নাম চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।