চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি দিন যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি এখন নতুন করে দেখা দিয়েছে সাপের উপদ্রব। পানিতে ডুবে থাকা এলাকায় আশ্রয়ের খোঁজে সাপ লোকালয়ে চলে আসছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্র, বাড়িঘর এবং জলাবদ্ধ এলাকায় সাপের কামড়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত সাপের কামড়ে অন্তত ৭৫ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আরও ২০ থেকে ২৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। যদিও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রামের জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ মেডিকেল টিম নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। এসব দল দুর্গত মানুষের কাছে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণ করছে।
তিনি জানান, দুর্গত এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি টিমকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে নৌকার মাধ্যমে তাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বন্যার সময় সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পেলেও এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে থাকায় সাপগুলো তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে মানুষের বসতবাড়ি, আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে।
ফলে মানুষ অজান্তেই সাপের সংস্পর্শে চলে আসছেন। বিশেষ করে রাতে চলাফেরা, ঘরের ভেতরে পানি জমে থাকা কিংবা পানিতে নেমে কাজ করার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি।
সিভিল সার্জন জানান, এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ৭৫ জন সাপের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সাপে কাটার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা হয়েছে।
বন্যার সময় শুধু সাপের উপদ্রবই নয়, পানিবাহিত রোগও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে ২০ থেকে ২৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো রোগীর সংখ্যা সীমিত থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। কারণ বন্যার পানি কমে গেলে দূষিত পানি, নষ্ট হয়ে যাওয়া টিউবওয়েল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার অবনতির কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বন্যার সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন গর্ভবতী নারী, নবজাতক এবং ছোট শিশুরা। তাদের জন্য জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে।
মেডিকেল টিমগুলো নিয়মিত দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করছে। কোথাও কোনো গর্ভবতী নারী প্রসববেদনায় আক্রান্ত হলে অথবা কোনো শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত নৌকার মাধ্যমে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের ফলে দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছে।
রাতে বাইরে বের হলে অবশ্যই টর্চলাইট ব্যবহার করতে হবে। পানিতে নামার আগে লাঠি দিয়ে জায়গাটি পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং যেখানে পানি জমে আছে সেখানে অযথা হাত বা পা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাপে কামড় দিলে কোনো ধরনের ঝাড়-ফুঁক, ওঝার চিকিৎসা বা ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা যাবে না। এতে সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।
বন্যার সময় নিরাপদ পানি ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পানি পান করতে হবে। খাবার ঢেকে রাখতে হবে এবং বাসনপত্র পরিষ্কার রাখতে হবে।
পাশাপাশি সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা এবং শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা প্রয়োজন। ডায়রিয়া বা বমি শুরু হলে দ্রুত খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানির ঘটনাও বেড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ জেলায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে।
এর মধ্যে কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি ২৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। চট্টগ্রামে মারা গেছেন ১৩ জন। বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বন্যা শুধু সম্পদের ক্ষতিই করছে না, মানুষের জীবনও কেড়ে নিচ্ছে।
চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সাপের কামড়, পানিবাহিত রোগ এবং দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো নানা চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগকে।
সরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই এই সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, সতর্ক থাকা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এই সময়েই সাধারণত পানিবাহিত রোগ এবং সাপের কামড়সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা এবং নিরাপদ জীবনযাপনের অভ্যাসই হতে পারে এই দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

