বিশ্বকাপ মানেই চাপ, প্রত্যাশা আর বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার লড়াই। কিন্তু সেই মঞ্চেই প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়ে বসলো ব্রাজিল। মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র—স্কোরলাইনটা যতটা সাধারণ মনে হয়, ভেতরের গল্পটা কিন্তু অনেক বেশি চিন্তার। এই ম্যাচটা যেন পরিষ্কার করে বলে দিল, ব্রাজিলের সামনে পথটা মোটেও সহজ না।
ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিট দেখলে মনে হচ্ছিল, এটা কি সত্যিই ব্রাজিল? পাস ভুল হচ্ছে, খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব—সব মিলিয়ে একদম অগোছালো ফুটবল। মারকুইনহোস, কাসেমিরো, পাকুয়েতা—যাদের ওপর ভরসা থাকার কথা, তারাই যেন ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
অন্যদিকে মরক্কো শুরু থেকেই দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলেছে। তারা বুঝে গিয়েছিল, এই ব্রাজিলকে চাপে ফেলা সম্ভব। তাই ডান-বাম সব দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে দেয়। একসময় মনে হচ্ছিল, মাঠটা যেন মরক্কোর দখলেই।
২১ মিনিটে ইসমাইল সাইবারি যখন গোল করলেন, তখন ব্রাজিলের রক্ষণ একদম স্থির হয়ে ছিল। ব্রাহিম দিয়াজের নিখুঁত পাস পেয়ে সাইবারি যেভাবে গোলটা করলেন, সেটা সত্যিই দেখার মতো।
এখানে বড় সমস্যা ছিল ডিফেন্সের সমন্বয়। দুই সেন্টার ব্যাক ঠিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেননি। ফলে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে নেয় মরক্কো। এই একটা মুহূর্তই পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দেয়।
গোল খাওয়ার পর ব্রাজিল কিছুটা ছন্দে ফেরে। আর ঠিক তখনই সামনে আসেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র।
বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে যে শটটা নিলেন, সেটা ছিল একেবারে নিখুঁত। এই গোলটা শুধু স্কোর সমান করেনি, দলের আত্মবিশ্বাসও কিছুটা ফিরিয়ে এনেছে।
অনেকদিন ধরে একটা কথা শোনা যাচ্ছিল—ক্লাবের হয়ে যতটা ভালো খেলেন, জাতীয় দলে ততটা পারেন না। এই ম্যাচে অন্তত সেই অভিযোগের জবাব দিয়েছেন তিনি। তবে বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন একা একজন খেলোয়াড় দলকে বাঁচাতে পারবে না।
এই ম্যাচে কাসেমিরোকে একদমই নিজের মতো লাগেনি। যেন খেলায় নেই, এমন একটা অবস্থা। পাস ভুল, পজিশনিং খারাপ—সব মিলিয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্স।
ফলে মাঝমাঠের ভার প্রায় একাই সামলাতে হয়েছে ব্রুনো গিমারায়েসকে। সে মোটামুটি ভালো খেললেও, একা তো পুরো দল চালানো সম্ভব না। এখানে একটা বড় সমস্যা হলো—দলে তরুণ খেলোয়াড়ের অভাব।
একসময় ব্রাজিলের ডিফেন্স মানেই ছিল শক্তিশালী দেয়াল। কাফু, রবার্তো কার্লোস, থিয়াগো সিলভা—এই নামগুলোই আলাদা আত্মবিশ্বাস দিত।
কিন্তু এখন সেই ধারটা যেন আর নেই। মারকুইনহোস আর গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ক্লাব পর্যায়ে ভালো খেললেও, জাতীয় দলে তাদের বোঝাপড়া এখনো ঠিক জমে ওঠেনি। ফলে ছোট ছোট ভুল বড় সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।
ব্রাজিলের ইতিহাসে রোনাল্ডো, রিভালদোর মতো কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ছিল। কিন্তু এখন সেই জায়গাটা ফাঁকা মনে হচ্ছে।
ইগর থিয়াগোকে সামনে খেলানো হয়েছে, কিন্তু তিনি তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি। সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি। ম্যাচে তাকে প্রায় দেখা যায়নি বললেই চলে।
এই জায়গাটা ঠিক না হলে, বড় ম্যাচে ব্রাজিল বিপদে পড়বে—এটা বলাই যায়।
মরক্কোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই—এই ম্যাচ সেটা আবার প্রমাণ করেছে। আগের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে সবাইকে চমকে দিয়েছিল তারা।
এবার তারা আরও পরিণত। দলে অভিজ্ঞতা আছে, সঙ্গে নতুন প্রতিভাও যোগ হয়েছে। আশরফ হাকিমির নেতৃত্বে তারা দারুণ সংগঠিত ফুটবল খেলছে।
এই ম্যাচেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা জয়ের জন্য লড়েছে। গোল না পেলেও তাদের প্রচেষ্টা চোখে পড়ার মতো।
দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের খেলা কিছুটা ভালো ছিল। তারা বল নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে, আক্রমণও করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোল বের করতে পারেনি।
এটা একটা ইতিবাচক দিক, কারণ অন্তত দলটা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। কিন্তু শুধু বোঝা যথেষ্ট না—এখন সেটাকে ঠিক করতে হবে।
মরক্কোর মতো দলের বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স হলে, স্পেন বা ফ্রান্সের মতো দলের বিরুদ্ধে কী হবে—এই প্রশ্নটাই এখন বড়।
বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু প্রতিভা নয়, দরকার দলগত বোঝাপড়া, ধারাবাহিকতা আর মানসিক দৃঢ়তা। এই জায়গাগুলোতেই এখন পিছিয়ে ব্রাজিল।
এই ম্যাচটা ব্রাজিলকে একটা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। মাঠে প্রমাণ করতে হয়।
ভিনিসিয়াসের গোল যেমন আশা দেখিয়েছে, তেমনই পুরো দলের পারফরম্যান্স চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি দ্রুত উন্নতি না হয়, তাহলে ট্রফির স্বপ্নটা অধরাই থেকে যেতে পারে।
সহজ করে বললে, এই ব্রাজিল এখনো তৈরি না। তবে সম্ভাবনা আছে। এখন দেখার বিষয়—তারা সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে কিনা।

