বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত এমন থাকে, যা সময় পেরিয়েও ভোলা যায় না। ঠিক তেমনই এক দিন ছিল ১৯৯৪ সালের ১৭ জুলাই। আমেরিকার রোজ বোল স্টেডিয়ামে প্রায় ৯৪ হাজার দর্শকের সামনে ইতালির স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল একটি পেনাল্টি মিস। রবার্তো বাজ্জিওর সেই ভুল আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। সেই হার শুধু ইতালির বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ করেনি, ভেঙে দিয়েছিল কার্লো আনচেলোত্তির স্বপ্নও।
আজ, ৩২ বছর পরে, ইতিহাস যেন এক অদ্ভুত বৃত্ত তৈরি করেছে। সেই আমেরিকার মাটিতেই আবার বিশ্বকাপ। তবে এবার আনচেলোত্তি ইতালির হয়ে নন—তিনি ব্রাজিলের দায়িত্বে। যে ব্রাজিল একসময় তার স্বপ্ন ভেঙেছিল, সেই দলকেই এবার তিনি চ্যাম্পিয়ন করতে চান।
কার্লো আনচেলোত্তির ফুটবল জীবন সব সময়ই নাটকীয়তায় ভরা। ১৯৮২ সালে ইতালি বিশ্বকাপ জিতলেও চোটের কারণে তিনি দলে সুযোগ পাননি। ১৯৮৬ সালে দলে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ খুব কম ছিল। ১৯৯০ সালে সেমিফাইনালে ইতালির হার তাকে বেঞ্চে বসেই দেখতে হয়েছিল। আর ১৯৯৪ সালে সহকারী কোচ হিসেবে ফাইনালে উঠেও শিরোপা হাতছাড়া।
এই ধারাবাহিক হতাশার পরও তিনি থামেননি। বরং সেই ব্যর্থতাগুলোই তাকে তৈরি করেছে আরও শক্তিশালী একজন কোচ হিসেবে।
আনচেলোত্তির কোচিং ক্যারিয়ার এক কথায় অসাধারণ। ইউরোপের বড় পাঁচটি লিগে শিরোপা জয়ের রেকর্ড রয়েছে তার। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন রেকর্ড পাঁচবার—যা তাকে বিশ্বের অন্যতম সফল কোচে পরিণত করেছে।
বিশেষ করে নকআউট টুর্নামেন্টে তার দক্ষতা চোখে পড়ার মতো। বড় ম্যাচে কীভাবে দলকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হয়, সেটা তিনি খুব ভালো বোঝেন। আর সেই কারণেই হয়তো ব্রাজিল অনেক বছর পর একজন বিদেশি কোচের ওপর ভরসা করেছে।
আনচেলোত্তি শুধু একজন ইতালিয়ান কোচ নন, তিনি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের একজন বড় ভক্তও। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পেলে, গার্সন, রিভেলিনোদের খেলা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের প্রতিভা তাকে অবাক করেছিল। সেই ভালোবাসাই হয়তো আজ তাকে ব্রাজিলের দায়িত্ব নিতে আরও আগ্রহী করেছে।
আনচেলোত্তির আরেকটি বড় শক্তি হলো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের সঙ্গে তার দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা। এসি মিলানে কাকা, কাফু, রোনাল্ডিনহো, রিভাল্ডো, রোনাল্ডো—সবাই তার অধীনে খেলেছেন। চেলসিতে ডেভিড লুইজ ও রামিরেজ, পিএসজিতে থিয়াগো সিলভা, আর রিয়াল মাদ্রিদে মার্সেলো, ক্যাসেমিরো, ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের সামলেছেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতা তাকে ব্রাজিল দলের মানসিকতা ও খেলার ধরন বুঝতে সাহায্য করেছে। তাই একজন বিদেশি কোচ হয়েও তিনি দলের ভেতরের বিষয়গুলো খুব সহজেই ধরতে পারেন।
আনচেলোত্তি দল গঠনে ভারসাম্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তার দলে যেমন ৩০ বছরের বেশি বয়সী অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে, তেমনি আছে তরুণ প্রতিভাও।
তিনি চান না দল শুধুই ব্যক্তিগত প্রতিভার ওপর নির্ভর করুক। বরং একটি ঐক্যবদ্ধ দল হিসেবে খেলুক। এই দর্শনই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
ক্যাসেমিরো ও নেইমারকে দলে ফেরানো তার বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। এর মাধ্যমে তিনি অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দুটোই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন।
তবে সবকিছু এত সহজ নয়। ব্রাজিল এখনও কিছু জায়গায় সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে ডিফেন্স ও মিডফিল্ডে স্থিরতা নেই। কাফু বা রবার্তো কার্লোসের মতো কিংবদন্তি ফুলব্যাকের অভাব এখনো স্পষ্ট।
স্ট্রাইকার পজিশনেও একই সমস্যা। রোনাল্ডোর পর সেই মানের একজন ফরোয়ার্ড খুঁজে পায়নি ব্রাজিল। ফলে আক্রমণভাগে ধার কমে গেছে।
বর্তমান ব্রাজিল দলের সবচেয়ে বড় ভরসা নেইমার। কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি গত কয়েক বছরে জাতীয় দলের হয়ে খুব কম খেলেছেন। চোটও তার ক্যারিয়ারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আনচেলোত্তি তাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করছেন ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলো—নেইমার কি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন?
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হবে আনচেলোত্তির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ক্লাব ফুটবলে তিনি যা অর্জন করেছেন, এখন সেটাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রমাণ করার সময়।
৩২ বছর আগে যে আমেরিকার মাটিতে তার স্বপ্ন ভেঙেছিল, সেখানেই এবার নতুন করে ইতিহাস গড়ার সুযোগ এসেছে। ব্রাজিলও বিশ্বাস করে, এই কঠিন সময়ে আনচেলোত্তির মতো অভিজ্ঞ কোচই তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা।
ফুটবল কখনো কখনো সিনেমার মতো গল্প তৈরি করে। আনচেলোত্তির এই যাত্রাও ঠিক তেমনই—ব্যর্থতা থেকে শেখা, নিজেকে গড়ে তোলা, আর শেষে নতুন করে স্বপ্ন দেখা।
এখন প্রশ্ন একটাই—২০২৬ সালের ১৯ জুলাই, তিনি কি সত্যিই ব্রাজিলের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দিতে পারবেন?
উত্তরটা সময়ই দেবে। তবে একটা কথা নিশ্চিত, এই গল্পটা শেষ পর্যন্ত দারুণ রোমাঞ্চকর হতে চলেছে।

