ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যেই সমঝোতার সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবার সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক আশ্বাস পাওয়ার কথা জানিয়েছে। দলটির দাবি, সরকারের প্রতিনিধিরা এমন একটি খসড়া বিজ্ঞপ্তি তাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং ভবিষ্যতে কোনো ধরনের পুলিশি হয়রানি না করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এই ঘোষণার ফলে কয়েকদিন ধরে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। যদিও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি ঘোষণা আসেনি, তবুও সিজেপির পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, দলের সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা তাদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সৌরভ দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকের সময় বিহার ও আসাম সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তুত করা একটি খসড়া বিজ্ঞপ্তি তাদের দেখানো হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে আন্দোলনের সময় দায়ের করা এফআইআর প্রত্যাহার করা হবে, আটক কিংবা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।
তার দাবি, এই পদক্ষেপ কেবল দুটি রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপি বা এনডিএ-শাসিত অন্যান্য রাজ্য থেকেও একই ধরনের আশ্বাসবহ বিজ্ঞপ্তি খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার তাদের পুনরায় আশ্বস্ত করেছে যে মঙ্গলবারের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারসহ অন্যান্য বিজেপি ও এনডিএ-শাসিত রাজ্যগুলো থেকেও একই ধরনের সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হবে।
সৌরভ দাস বলেন, তারা আশা করছেন আলোচনায় যেসব ভাষা ও শর্তে ঐকমত্য হয়েছে, সরকারি ঘোষণাতেও সেই ভাষাই অনুসরণ করা হবে। এতে আন্দোলনকারীদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই দূর হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
তিনি আরও বলেন, আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক হলেও দল পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের লক্ষ্য থেকে তারা সরে আসবেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তার শেষাংশে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্য দেন সৌরভ দাস।
তিনি লেখেন, কোনো আন্দোলনকারীকে একা ফেলে রাখা হবে না। আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দল সবসময় তাদের পাশে থাকবে।
এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। দীর্ঘদিন ধরে মামলা, গ্রেপ্তার এবং প্রশাসনিক চাপের মুখে থাকা আন্দোলনকারীদের জন্য এমন বার্তা মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করা হচ্ছে।
এই ইতিবাচক অগ্রগতির খবর এমন সময় সামনে এসেছে, যখন কয়েক ঘণ্টা আগেই সিজেপি দেশজুড়ে আবারও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
দলটির অভিযোগ ছিল, গত ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর ৪৯ দিনের নিট প্রশ্নফাঁসবিরোধী আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল সরকারের আশ্বাসের ভিত্তিতে। কিন্তু সেই সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি।
তাদের মতে, কেন্দীয় সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। এ কারণেই সিজেপির পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্লি।
সিজেপির দাবি অনুযায়ী, ২৫ জুলাইয়ের সমঝোতায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল।
এর মধ্যে অন্যতম ছিল আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব এফআইআর প্রত্যাহার করা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কারও বিরুদ্ধে নতুন মামলা না করার নিশ্চয়তাও দেওয়ার কথা ছিল।
এ ছাড়া আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিশেষ করে নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার শিকারদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
পরীক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য পাঁচ দফা প্রস্তাব বিবেচনার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে সিজেপি।
সিজেপি শুরু থেকেই শুধু মামলা প্রত্যাহার নয়, দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের দাবিও জানিয়ে আসছে।
দলটির মতে, নিট প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা নষ্ট করেছে। তাই শুধু দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না, পুরো পরীক্ষা পরিচালনা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
তাদের প্রস্তাবিত পাঁচ দফা সনদে পরীক্ষার নিরাপত্তা জোরদার, প্রশ্নপত্র সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা, স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া, শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে সোমবার সিজেপি একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যসভার সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিবাল।
সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির নেতারা অভিযোগ করেন, ২৫ জুলাইয়ের সমঝোতার পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে।
তাদের দাবি, সরকার প্রকাশ্যে সমঝোতার কথা বললেও বাস্তবে অনেক জায়গায় নতুন করে হয়রানি, জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রশাসনিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। এতে সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কপিল সিবালও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, যদি সরকার সত্যিই সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ বন্ধ করা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে যদি সত্যিই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলাবস্থার অবসান ঘটতে পারে।
তবে তারা এটিও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে লিখিত সরকারি নির্দেশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লিখিত নির্দেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক পর্যায়ে বাস্তব পরিবর্তন আসা কঠিন।
এখন সবার নজর কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপি বা এনডিএ-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের সম্ভাব্য সরকারি ঘোষণার দিকে। যদি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, তাহলে সিজেপি আন্দোলন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে পারে।
অন্যদিকে, ঘোষণায় বিলম্ব হলে বা প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার অমিল দেখা দিলে আন্দোলন আবারও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সমাধান নির্ভর করবে সরকারের লিখিত সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়নের ওপর। ফলে আগামী কয়েকদিন এই ইস্যু ভারতের রাজনীতি ও শিক্ষা অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে থাকবে।
তথ্য সুত্র: ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে

