শর্তসাপেক্ষে আবারও চালু হলো আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: ফাইল ছবি
রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর সাময়িকভাবে লাইসেন্স হারিয়েছিল। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর সরকারের পক্ষ থেকে তিনটি নির্দিষ্ট শর্তে হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহাল করা হয়েছে। এর ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আবারও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পেয়েছে।
সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে জানানো হয়, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়ায় আগের লাইসেন্স বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করে হাসপাতালটিকে পুনরায় কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই অনুমতি সম্পূর্ণভাবে তিনটি শর্ত মেনে চলার ওপর নির্ভরশীল।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স ও মানবসম্পদ) তারিকুল ইসলাম মুকুল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর হাসপাতালটি আজ সোমবার থেকেই চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারের দেওয়া সব নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করবে এবং রোগীদের নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
সরকারি আদেশে হাসপাতালের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমত, হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২-এর সব বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডিউটি ডাক্তার ও নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা হাসপাতালের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে যদি লাইসেন্সের কোনো শর্ত লঙ্ঘন করা হয়, তাহলে সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে আপিল করে। সেই আপিল এবং সংশ্লিষ্ট বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
গত ১৫ জুলাই তদন্ত কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কমিটি হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, জনবল, নবজাতক পরিচর্যা ইউনিট এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
সরকারের মতে, তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে যা হাসপাতালের কার্যক্রম পুনরায় চালুর জন্য সন্তোষজনক বিবেচিত হয়েছে। তাই পূর্বের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সম্প্রতি হাসপাতালটিতে ছয় নবজাতক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একাধিক পরিবার অভিযোগ করে, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি এবং প্রয়োজনীয় নজরদারির অভাবের কারণে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং লাইসেন্সের শর্ত মানা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তদন্ত চলাকালীন সময়েই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল।
এই সিদ্ধান্তের ফলে হাসপাতালের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং নতুন রোগী ভর্তি গ্রহণও স্থগিত রাখা হয়।
লাইসেন্স বাতিলের পর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে আপিল করে। তারা দাবি করে, হাসপাতাল পরিচালনায় যেসব সীমাবদ্ধতা ছিল, সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে।
আপিলের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যাখ্যাও জমা দেয়। এরপর সরকার তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুরো বিষয়টি পুনরায় মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়।
তদন্তে হাসপাতালের জনবল সংক্রান্ত বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের বিষয়টি লাইসেন্স পুনর্বহালের অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি হাসপাতালের সেবার মান অনেকাংশেই নির্ভর করে দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর। জনবল কম থাকলে রোগীদের প্রয়োজনীয় সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
লাইসেন্স ফিরে পেলেও ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বা লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে আবারও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ হাসপাতালটির প্রতিটি কার্যক্রম এখন থেকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকতে পারে।
হাসপাতালের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় অনেক রোগী ও স্বজন স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তবে একই সঙ্গে তারা আশা করছেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করবে।
বিশেষ করে নবজাতক ও নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নিয়মিত তদারকির বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

