বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে আবহাওয়ার একাধিক অনুকূল ব্যবস্থা। দক্ষিণবঙ্গ ও সংলগ্ন বাংলাদেশের ওপর অবস্থান করা ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ঘূর্ণাবর্তটি ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করায় দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করেছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। সমুদ্রও উত্তাল হয়ে উঠেছে, ফলে মৎস্যজীবীদের জন্য জারি হয়েছে বিশেষ নিষেধাজ্ঞা।
অন্যদিকে, কলকাতায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা না থাকলেও আগামী দু’দিন বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে সপ্তাহের শুরুতে রাজ্যের আবহাওয়া থাকবে সম্পূর্ণ বর্ষামুখর।
আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণবঙ্গ ও সংলগ্ন বাংলাদেশের ওপর থাকা ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ অঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ঘূর্ণাবর্তটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯.৪ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থান করছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই নিম্নচাপ আরও সুস্পষ্ট ও সংগঠিত হতে পারে। এর ফলে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
একই সময়ে বর্ষাকালীন অক্ষরেখাও রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এই দুটি আবহাওয়াগত ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী দু’দিন দক্ষিণবঙ্গের সাতটি জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই জেলাগুলি হলো—
- দক্ষিণ ২৪ পরগনা
- পূর্ব মেদিনীপুর
- পশ্চিম মেদিনীপুর
- পশ্চিম বর্ধমান
- ঝাড়গ্রাম
- পুরুলিয়া
- বাঁকুড়া
এই জেলাগুলিতে ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও অল্প সময়ের মধ্যেই ভারী বর্ষণ হওয়ায় জল জমার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
রাজ্যের অন্যান্য জেলার তুলনায় কলকাতার জন্য আপাতত স্বস্তির খবর রয়েছে। শহরে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
তবে রবিবার ও সোমবার বিক্ষিপ্তভাবে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। দিনের বিভিন্ন সময়ে আকাশ মেঘলা থাকবে এবং মাঝেমধ্যেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে।
ফলে অফিসযাত্রী ও সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শুধু ভারী বৃষ্টিই নয়, দক্ষিণবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, অনেক জায়গায় ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। বজ্রবিদ্যুতের সময় খোলা জায়গায় না থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
তবে মঙ্গলবারের পর থেকে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর বিক্ষিপ্তভাবে হালকা বা মাঝারি বৃষ্টি চললেও আপাতত বড় ধরনের ঝড় বা ভারী বর্ষণের আশঙ্কা নেই।
নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রের পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই উত্তাল হয়ে উঠেছে।
সমুদ্রে ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪৫ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইছে। এর ফলে সোমবার পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করেছে আবহাওয়া দফতর।
যাঁরা ইতিমধ্যেই গভীর সমুদ্রে রয়েছেন, তাঁদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়ার উন্নতি হলে সোমবারের পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয়, উত্তরবঙ্গেও আগামী কয়েক দিন বৃষ্টির দাপট বজায় থাকবে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী—
- মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দার্জিলিংয়ে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
- জলপাইগুড়ি ও কালিম্পঙে সোমবার থেকে আগামী শনিবার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
- আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারেও মঙ্গলবারের পর থেকে বিক্ষিপ্তভাবে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই চার জেলায় হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলেও আপাতত কোনও বিশেষ আবহাওয়া সতর্কতা জারি হয়নি।
একটানা বৃষ্টির কারণে কলকাতার তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের নিচে নেমে এসেছে।
রবিবার সকালে শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ০.২ ডিগ্রি কম। শনিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ ডিগ্রি কম।
মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির কারণে আগামী কয়েক দিন তাপমাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, দক্ষিণবঙ্গে বর্ষা এখনও সক্রিয় রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ এবং শক্তিশালী ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দক্ষিণ ও উত্তরদুই বঙ্গেই বৃষ্টির দাপট বজায় থাকবে।
বিশেষ করে ভারী বৃষ্টিপ্রবণ জেলাগুলির বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনো, জল জমা এলাকায় সতর্কভাবে চলাচল করা এবং বজ্রপাতের সময় নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্যজীবীদের সরকারি নির্দেশ মেনে সমুদ্রে না যাওয়ার আবেদন জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।

