সময়ে বর্ষা এলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি
পশ্চিমবঙ্গে নির্ধারিত সময়েই বর্ষার আগমন ঘটেছে। উত্তরবঙ্গে ৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে, যা স্বাভাবিক সময়সীমার মধ্যেই পড়ে। তবে বর্ষা ঢোকার পরও রাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত হয়নি। জুন মাসের প্রথম ১৬ দিনে রাজ্যের ১০টি জেলায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির ঘাটতি দেখা গেছে। আবহাওয়া দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে কলকাতাতেও স্বাভাবিকের তুলনায় ৩৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির ঘাটতি উত্তর দিনাজপুরে
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত উত্তর দিনাজপুর জেলায় মাত্র ৪৬.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ফলে সেখানে বৃষ্টির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে, যা রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এর পরেই রয়েছে ঝাড়গ্রাম, যেখানে বৃষ্টির ঘাটতি ৬১ শতাংশ। আবহবিদদের মতে, কোনও এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৬০ শতাংশের বেশি বৃষ্টির ঘাটতি থাকলে সেটিকে “অত্যন্ত কম বৃষ্টিপাত” হিসেবে ধরা হয়। সেই হিসেবে উত্তর দিনাজপুর ও ঝাড়গ্রাম বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে।
যেসব জেলায় বৃষ্টির ঘাটতি বেশি
জুনের প্রথমার্ধে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য ঘাটতির তালিকায় রয়েছে—
• উত্তর দিনাজপুর – ৭১ শতাংশ
• ঝাড়গ্রাম – ৬১ শতাংশ
• পশ্চিম বর্ধমান – ৫৪ শতাংশ
• কালিম্পং – ৫২ শতাংশ
• দক্ষিণ ২৪ পরগনা – ৪২ শতাংশ
• বাঁকুড়া – ৪১ শতাংশ
• কলকাতা – ৩৯ শতাংশ
• আলিপুরদুয়ার – ৩০ শতাংশ
• দক্ষিণ দিনাজপুর – ২৩ শতাংশ
• জলপাইগুড়ি – ২৩ শতাংশ
কলকাতায় ১ থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ৭৩.১ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কম।
কিছু জেলায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বজায় রয়েছে
যদিও রাজ্যের একাধিক জেলা বৃষ্টির ঘাটতিতে ভুগছে, তবুও কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক। দার্জিলিং, কোচবিহার, মালদহ, বীরভূম, পুরুলিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পূর্ব মেদিনীপুরে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক মাত্রায় রয়েছে।
আবহাওয়া দফতরের নিয়ম অনুযায়ী, কোনও এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম বা বেশি বৃষ্টি হলে তাকে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হিসেবে গণ্য করা হয়।
কোথাও কোথাও স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি বৃষ্টি
রাজ্যের পাঁচটি জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে নদিয়ায়।
জেলাভিত্তিক অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের হার—
• নদিয়া – ৫৫ শতাংশ বেশি
• হাওড়া – ৪৫ শতাংশ বেশি
• মুর্শিদাবাদ – ২৭ শতাংশ বেশি
• হুগলি – ২১ শতাংশ বেশি
• পূর্ব বর্ধমান – ২০ শতাংশ বেশি
তবে এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের কোনও জেলাতেই “অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাত” হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
সারা দেশেই বর্ষার গতি মন্থর
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশেই বর্ষার অগ্রগতি এই মুহূর্তে কিছুটা ধীর। চলতি বছর কেরল উপকূল দিয়ে সময়মতো মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করলেও পরে তার সক্রিয়তা কমে যায়।
ভারতের আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৪ জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সারা দেশে মাত্র ১৯.২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অথচ এই সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ছিল ৫৩.৭ মিলিমিটার। অর্থাৎ জাতীয় স্তরে বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ৬৪ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, বর্ষা উপস্থিত থাকলেও প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত এখনও দেখা যাচ্ছে না।
উপগ্রহচিত্রে উদ্বেগ, নেই পর্যাপ্ত মেঘের উপস্থিতি
১৫ জুনের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে আবহবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাধারণত সক্রিয় বর্ষার সময়ে দেশের বিস্তীর্ণ অংশে ঘন মেঘের বিস্তার দেখা যায়। কিন্তু এবারের ছবিতে দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ অঞ্চলেই আকাশ অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার।
শুধুমাত্র হিমালয় সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব ভারত এবং গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে কিছু মেঘ জমতে দেখা গেছে। ফলে বৃষ্টির সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়েছে।
পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবেই কমছে বৃষ্টি
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো শক্তিশালী পশ্চিমা বায়ু প্রবাহ। সাধারণ অবস্থানের তুলনায় এই বায়ুপ্রবাহ অনেক দক্ষিণে নেমে এসেছে।
এর ফলে পূর্বমুখী বায়ুপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মূলত এই পূর্বমুখী বায়ুই ভারতের মৌসুমি বায়ুর কার্যকারিতা, মেঘ সৃষ্টি এবং বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাভাবিক সময়ে এই বায়ুর প্রভাবে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
কিন্তু এবার শক্তিশালী পশ্চিমা বায়ুর কারণে পর্যাপ্ত মেঘ তৈরি হতে পারছে না। ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্প থাকলেও বৃষ্টি হচ্ছে না প্রত্যাশিত পরিমাণে।
এল নিনোর প্রভাবও ফেলতে পারে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ আবহাওয়াগত ঘটনা ‘এল নিনো’-র প্রভাবও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী হতে পারে।
ইতিমধ্যেই এল নিনোর উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া সংস্থাগুলি। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, এল নিনোর কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়।
তাই চলতি মৌসুমেও আবহবিদরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন।
উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা, দক্ষিণবঙ্গে গরমের সতর্কতা
যদিও বর্তমানে বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে, তবুও আগামী কয়েক দিনে উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের কিছু এলাকায় ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। দার্জিলিং, কালিম্পং ও কোচবিহারেও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে অস্বস্তিকর গরমের কারণে হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এছাড়া উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়ায় হালকা বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সময়ে বর্ষা প্রবেশ করলেও পশ্চিমবঙ্গে এখনও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা মিলছে না। উত্তর দিনাজপুর থেকে কলকাতা— একাধিক জেলা বৃষ্টির ঘাটতির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আবহবিদদের মতে, পশ্চিমা বায়ুর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা এবং সম্ভাব্য এল নিনো পরিস্থিতি এই ঘাটতির অন্যতম কারণ। তবে উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে। এখন নজর থাকবে আগামী কয়েক সপ্তাহে মৌসুমি বায়ু কতটা সক্রিয় হয় এবং রাজ্যের বৃষ্টির ঘাটতি কত দ্রুত পূরণ হয় তার দিকে।

