বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যাংকিং খাতে এক সময় সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এস আলম গ্রুপ। বিদ্যুৎ, ইস্পাত, চিনি, ভোজ্যতেল, সিমেন্ট, জাহাজ পরিবহন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে ছিল তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি। বিশেষ করে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রুপটি এক সময় অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও আর্থিক বাস্তবতায় সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। একের পর এক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারানো, আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্ত, আদালতের নির্দেশে সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ, নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা সীমিত হয়ে যাওয়া এবং তীব্র তারল্য সংকটের কারণে বর্তমানে এস আলম গ্রুপকে ব্যবসা সংকোচনের পথে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকায় গ্রুপটির ১১টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এস আলম গ্রুপ কি ধীরে ধীরে দেশের ব্যবসা কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে, নাকি এটি সাময়িক সংকট?
ব্যবসায়িক বিশ্লেষকদের মতে, এস আলম গ্রুপের দ্রুত সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল ব্যাংকিং খাতে তাদের শক্তিশালী অবস্থান। এক সময় গ্রুপটির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছিল দেশের একাধিক ইসলামী ও বেসরকারি ব্যাংকে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় তাদের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ব্যবসায়ী পরিবারের এতগুলো ব্যাংকের ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বিরল ঘটনা। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ওপর এই প্রভাবের মাধ্যমে গ্রুপটি সহজে বিপুল পরিমাণ ঋণ সুবিধা পেয়েছে, যা পরবর্তীতে তাদের শিল্প সাম্রাজ্য বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিভিন্ন সময়ে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছিল, যার একটি বড় অংশ পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বড় অংশ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে দেখা গেছে, ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানতের মূল্য ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের পরিমাণ এবং জামানতের মূল্যের মধ্যে এত বড় ব্যবধান দেশের আর্থিক তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। তারা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সময়মতো কার্যকর ভূমিকা পালন করলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না।
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো অর্থ পাচার। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থের একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট, হুন্ডি এবং অন্যান্য আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সাইপ্রাসসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দেশ-বিদেশে সম্পদ অনুসন্ধান এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান বড় ধরনের সাফল্য আসেনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের ওপর নির্ভরশীল।
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপের অবস্থানে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। বাংলাদেশ ব্যাংক ধাপে ধাপে গ্রুপটির প্রভাবাধীন বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয় এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এর ফলে গ্রুপটির দীর্ঘদিনের আর্থিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকভিত্তিক অর্থায়নের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় এসব পদক্ষেপের প্রভাব এস আলম গ্রুপের ব্যবসায় দ্রুত পড়তে শুরু করে।
গ্রুপটির বিভিন্ন শিল্প ইউনিট মূলত আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ইস্পাত, চিনি, ভোজ্যতেল এবং সিমেন্ট শিল্পে নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যেতে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত হয়ে যাওয়ার কারণে নতুন এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কাঁচামাল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হয় এবং উৎপাদন কার্যক্রম ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অনেক কারখানা আংশিক উৎপাদন চালালেও বেশ কয়েকটি ইউনিট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে এস আলম গ্রুপের ১১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চিনি, ইস্পাত, সিমেন্ট, ভোজ্যতেল এবং প্যাকেজিং খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে এস আলম রিফাইন্ড সুগার, এস আলম স্টিল, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, ইনফিনিটি সিআর স্ট্রিপস, চেমন ইস্পাত, গ্যালকো স্টিল, এস আলম সিমেন্ট, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল এবং এস আলম ব্যাগসহ আরও কয়েকটি শিল্প ইউনিট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করতেন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের বড় অংশ বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এস আলম গ্রুপের বর্তমান সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রমিক ও তাদের পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে এসব কারখানায় কর্মরত বহু শ্রমিক হঠাৎ করেই আয়ের উৎস হারিয়েছেন।
শুধু শ্রমিকই নয়, ক্ষতির মুখে পড়েছেন কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানও। অনেক স্থানীয় অর্থনীতি এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে কারখানা বন্ধের প্রভাব আশপাশের এলাকাগুলোতেও পড়ছে।
একজন কর্মকর্তা জানান, শুধু এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজেই প্রায় ৭০০ স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। অন্য ইউনিটগুলো মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি ও করপোরেট সুশাসন বিশ্লেষকরা মনে করেন, এস আলম গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাদের মতে, যখন কোনো শিল্পগোষ্ঠী স্বাভাবিক ব্যাংকিং নীতির বাইরে বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভর করে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটায়, তখন সেই সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে পুরো ব্যবসায়িক কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ে।
ব্যাংকনির্ভর অস্বচ্ছ অর্থায়ন, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, অতিরিক্ত ঋণনির্ভর ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারি সবকিছু মিলেই বর্তমান সংকটের পটভূমি তৈরি করেছে বলে তারা মনে করেন।

