ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার (৩১ জুলাই) বিকেলে তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার বিভিন্ন সড়ক, আবাসিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি নগরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক নগর পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে নিজের বাসভবনে তলব করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে তিনি সরেজমিন পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে বের হন। পুরো সফরে তিনি নিজেই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেন, যা উপস্থিত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের রুট ছিল রাজধানীর উত্তরাংশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। তিনি ইসিবি চত্বর থেকে যাত্রা শুরু করে মিরপুর ডিওএইচএস, দিয়াবাড়ি, উত্তরা সেক্টর ৩, ৪, ৫ ও ৬ ঘুরে দেখেন। এরপর এয়ারপোর্ট রোড হয়ে কাকলী মোড়, মহাখালী, ফার্মগেট, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদগেট, মোহাম্মদপুর, সলিমুল্লাহ রোড, ইকবাল রোড, তাজমহল রোড এবং জাপান গার্ডেন সিটি এলাকায় যান।
পরবর্তীতে তিনি শ্যামলী মোড়, গণভবন মোড়, জিয়া উদ্যান, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর-১০, কচুক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, সৈনিক ক্লাব, কাকলী এবং বনানী এলাকা পরিদর্শন করেন। দীর্ঘ এই সফর শেষে সন্ধ্যায় গুলশান এভিনিউয়ের সরকারি বাসভবনে ফিরে আসেন প্রধানমন্ত্রী।
পুরো যাত্রাপথে তিনি বিভিন্ন এলাকার বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ করেন এবং কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা সরাসরি দেখার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে নগরের পরিচ্ছন্নতা, সড়কের অবস্থা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সবুজায়নের অগ্রগতি তার পর্যবেক্ষণের প্রধান বিষয় ছিল।
পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। কোথাও ময়লা-আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে রাখা হচ্ছে কি না, নিয়মিত অপসারণ হচ্ছে কি না এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কার্যক্রম কতটা কার্যকর—এসব বিষয় তিনি খতিয়ে দেখেন।
নগর ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য অপসারণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজধানীর দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা এবং প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদনের কারণে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের আরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।
নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নের বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন সড়কের মিডিয়ান, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান এবং সড়কের পাশের বৃক্ষরোপণের অগ্রগতি তিনি সরেজমিনে দেখেন।
যেসব এলাকায় সবুজায়নের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে বিদ্যমান গাছপালার সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করারও নির্দেশনা দেন।
বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই বাস্তবতা বিবেচনায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও ছিল প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি বিভিন্ন এলাকার ড্রেন, খাল, নালা এবং পানি প্রবাহের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। কোথাও ড্রেন বন্ধ হয়ে আছে কি না, কোথাও পানি জমে থাকছে কি না কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে কি না এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হয়।
পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নগরবাসী যাতে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর তিনি জোর দেন।
সরেজমিন পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান কিছু সমস্যা শনাক্ত করেন। সরকারি সূত্র জানায়, কয়েকটি বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, অব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং কিছু এলাকায় নাগরিক সেবার মান নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের বাস্তবভিত্তিক সমাধান গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান, নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক ও সক্রিয় হতে হবে।
পরিদর্শন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেই ক্ষান্ত হননি; বরং বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনাও দেন। কোথায় কীভাবে কাজের গতি বাড়ানো যায়, কোন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন এবং নাগরিক সেবার মান কীভাবে উন্নত করা যায় এসব বিষয়ে তিনি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি বাড়াতে হবে এবং যে কোনো সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের ভোগান্তি কমানোই হতে হবে নগর ব্যবস্থাপনার প্রধান লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন মৃধা, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী উপস্থিত ছিলেন।
সফর চলাকালে তারা বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল দাপ্তরিক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর না করে মাঠপর্যায়ে সরাসরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর সমাধান বাস্তবায়ন সহজ হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শনও সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখে তিনি বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন।
নগর উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত সবুজায়নও একটি আধুনিক শহরের অপরিহার্য উপাদান। এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রীর এই সরেজমিন পরিদর্শন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
পরিদর্শনের মাধ্যমে তিনি নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নগরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাজধানী গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, পরিদর্শনের সময় চিহ্নিত হওয়া সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের মাঠপর্যায়ের তদারকি অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।

