খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভখাবার নয়, মানুষ থাকবে ফ্রিজে! জাপানের ‘হিউম্যান রেফ্রিজারেটর’ ঘিরে বিশ্বজুড়ে তুমুল চর্চা

খাবার নয়, মানুষ থাকবে ফ্রিজে! জাপানের ‘হিউম্যান রেফ্রিজারেটর’ ঘিরে বিশ্বজুড়ে তুমুল চর্চা

ব্যবহারকারী ভেতরে ঢুকে একটি আরামদায়ক চেয়ারে বসবেন। এরপর বিশেষ কুলিং সিস্টেম শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ—যেমন মাথা, ঘাড়, কাঁধ এবং কোমরের দিকে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত করবে।

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনেক দেশেই গরম এখন রেকর্ড ছুঁয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন নতুন সমাধান নিয়ে কাজ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় জাপান থেকে এসেছে এক অভিনব উদ্ভাবন—‘হিউম্যান রেফ্রিজারেটর’।

নাম শুনে অনেকেই অবাক হতে পারেন। কারণ সাধারণভাবে ফ্রিজ বলতে আমরা বুঝি এমন একটি যন্ত্র, যেখানে শাকসবজি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম কিংবা রান্না করা খাবার সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু এই নতুন ধরনের ফ্রিজে রাখা হবে না কোনো খাদ্যপণ্য। বরং কয়েক মিনিটের জন্য এর ভেতরে বসবেন মানুষ, আর মুহূর্তেই মিলবে তীব্র গরম থেকে স্বস্তি।

জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশ বর্তমানে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করা কিংবা যাতায়াত করা মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ক্লান্তি এবং শারীরিক দুর্বলতার মতো সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতেও তাপজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তাই মানুষের শরীর দ্রুত ঠান্ডা করার কার্যকর উপায় খুঁজছিল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

হিউম্যান রেফ্রিজারেটর মূলত একটি বিশেষ কুলিং বুথ, যেখানে একজন ব্যক্তি কয়েক মিনিটের জন্য প্রবেশ করতে পারেন। এটি দেখতে অনেকটা ছোট একটি ব্যক্তিগত কেবিনের মতো।

আরও পড়ুন :  ৪২°C ছুঁইছুঁই তাপমাত্রা! ফ্রান্সে দাবদাহে মৃত্যু বাড়ছে, বিপদে ইউরোপ

ব্যবহারকারী ভেতরে ঢুকে একটি আরামদায়ক চেয়ারে বসবেন। এরপর বিশেষ কুলিং সিস্টেম শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ—যেমন মাথা, ঘাড়, কাঁধ এবং কোমরের দিকে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত করবে।

মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই শরীরের অতিরিক্ত তাপ কমে যাবে এবং ব্যবহারকারী নিজেকে অনেক বেশি সতেজ অনুভব করবেন।

সাধারণ এয়ার কন্ডিশনার একটি পুরো ঘর ঠান্ডা করে। কিন্তু হিউম্যান রেফ্রিজারেটর শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির শরীরকে লক্ষ্য করে কাজ করে।

এর ভেতরে থাকা বিশেষ সেন্সর ব্যবহারকারীর অবস্থান শনাক্ত করে নির্দিষ্ট অংশে ঠান্ডা বাতাস পৌঁছে দেয়। ফলে অল্প সময়েই শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে সাহায্য করে।

এতে পুরো কক্ষ ঠান্ডা করার প্রয়োজন হয় না। ফলে শক্তি সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

জাপানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা—দুই-ই অনেক বেশি থাকে। এই আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় কাজ করলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি এতটাই কঠিন যে কিছু প্রতিষ্ঠানে পুরুষ কর্মীদের আরামদায়ক পোশাক, এমনকি হাঁটু পর্যন্ত ছোট প্যান্ট পরে অফিস করার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।

তবুও অনেক কর্মী প্রচণ্ড গরমে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন না। তাই অফিস, কারখানা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ধরনের দ্রুত শীতলীকরণ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন :  খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেবে ইরান:জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ

প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, প্রথম ধাপে এটি সাধারণ মানুষের বাড়িতে নয়, বরং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্ভাব্য ব্যবহার ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে—

  • অফিস ভবন
  • শিল্পকারখানা
  • গুদাম
  • নির্মাণ প্রকল্প
  • বড় শপিং সেন্টার
  • বিমানবন্দর
  • রেলস্টেশন
  • ক্রীড়া ভেন্যু

বিশেষ করে যেসব কর্মী দীর্ঘ সময় গরম পরিবেশে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এটি বড় সুবিধা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় থাকলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। এতে হিট এক্সহসশন এবং হিট স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যদি কেউ সময়মতো শরীর ঠান্ডা করতে পারেন, তাহলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

হিউম্যান রেফ্রিজারেটর সেই লক্ষ্যেই কাজ করবে। তবে এটি কোনো চিকিৎসা যন্ত্র নয়। বরং অতিরিক্ত গরমে দ্রুত আরাম দেওয়ার একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা।

জাপানের সংবাদমাধ্যম জাপান টুডে-তে এই প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

কারণ এর আগে মানুষকে কয়েক মিনিটের জন্য ঠান্ডা করার উদ্দেশ্যে এমন বিশেষ রেফ্রিজারেশন বুথ খুব একটা দেখা যায়নি।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে, তখন এই ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতের নগরজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতের সংস্করণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্মার্ট সেন্সর এবং স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তিও যুক্ত হতে পারে।

আরও পড়ুন :  গ্রামের পথে ঘোড়ায় চড়ে জনগণনা, শিক্ষকের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে চমকে গেলেন সবাই

তখন ব্যবহারকারীর শরীরের তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন এবং ঘামের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপযুক্ত মাত্রার শীতল বাতাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

এছাড়া সৌরশক্তিচালিত মডেল বা বহনযোগ্য সংস্করণ তৈরির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না গবেষকেরা।

বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে শুধু এয়ার কন্ডিশনারের ওপর নির্ভর না করে লক্ষ্যভিত্তিক শীতলীকরণ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও জনপ্রিয় হতে পারে।

হিউম্যান রেফ্রিজারেটর সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ, যেখানে পুরো ঘর নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী একজন মানুষকে দ্রুত ঠান্ডা করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্যই তৈরি হয়। জাপানের হিউম্যান রেফ্রিজারেটর তারই একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এটি খাবার সংরক্ষণের ফ্রিজ নয়; বরং প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত মানুষের জন্য কয়েক মিনিটের আরামের আশ্রয়।

যদিও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মূলত বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে, তবুও ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন তাপপ্রবাহ নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে, তখন মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের উদ্ভাবন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।