ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক মঞ্চের উত্তেজনা পেরিয়ে আবার শুরু হয়েছে ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ততা। তবে বিশ্বকাপ শুধু জাতীয় দলগুলোর লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশ্বের শীর্ষ ক্লাবগুলোরও বড় ধরনের আর্থিক স্বার্থ। বিশ্বকাপে নিজেদের ফুটবলারদের অংশগ্রহণের বিনিময়ে ফিফার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ পেয়ে থাকে বিভিন্ন ক্লাব। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবার সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে ইংল্যান্ডের জায়ান্ট ক্লাব ম্যাঞ্চেস্টার সিটি।
বিশ্বকাপ এলেই বিশ্বের নামী ক্লাবগুলোর চোখ থাকে নিজেদের ফুটবলারদের দিকে। কে কেমন খেলছেন, কে নতুন তারকা হয়ে উঠছেন কিংবা কে চোটে পড়ছেন—সবকিছুই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ক্লাবগুলো।
অনেক তরুণ ফুটবলার বিশ্বকাপের মঞ্চে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন। পরবর্তীতে তাঁদের দলে ভেড়াতে আগ্রহ দেখায় ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো। ফলে বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, এটি ভবিষ্যতের তারকা খোঁজারও অন্যতম বড় মঞ্চ।
তবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক সুবিধা। বিশ্বকাপে ফুটবলারদের জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পাঠানোর জন্য ফিফা সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ প্রদান করে। এই অর্থই ক্লাবগুলোর জন্য অতিরিক্ত আয়ের একটি বড় উৎস।
ফুটবলাররা সাধারণত বছরের বেশিরভাগ সময় নিজ নিজ ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকেন। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে গেলে তাঁদের ক্লাবের অনুমতি প্রয়োজন হয়। সেই কারণেই ফিফা চালু করেছে ক্লাব বেনিফিট প্রোগ্রাম।
এই কর্মসূচির আওতায় বিশ্বকাপ চলাকালীন জাতীয় দলে অংশ নেওয়া ফুটবলারদের জন্য সংশ্লিষ্ট ক্লাবকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ক্লাবগুলো খেলোয়াড়দের ছাড় দেওয়ার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে এই কর্মসূচির জন্য ফিফা মোট ৩৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত ক্লাব এই তহবিল থেকে অর্থ পেয়েছে।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ফুটবলার জাতীয় দলে পাঠানো ক্লাবগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ম্যাঞ্চেস্টার সিটি। ফলে আর্থিক দিক থেকেও সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান শক্তিশালী এই ক্লাবটি।
ফিফার ক্লাব বেনিফিট প্রোগ্রাম থেকে ম্যাঞ্চেস্টার সিটি পেয়েছে প্রায় ৪২ কোটি টাকা। বিশ্বকাপ শেষে ক্লাবগুলোর আয় তালিকায় এটি সর্বোচ্চ।
সিটির হয়ে খেলতে যাওয়া একাধিক তারকা ফুটবলার বিভিন্ন দেশের জার্সিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সেই উপস্থিতিই ক্লাবটির আয় বাড়িয়েছে।
স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনাও বিশ্বকাপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফুটবলার পাঠিয়েছিল। তার ফলস্বরূপ ক্লাবটি ফিফার কাছ থেকে প্রায় ৩৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা পেয়েছে।
গত কয়েক বছরে আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বার্সেলোনা। তাই এই অতিরিক্ত আয় ক্লাবটির জন্য কিছুটা হলেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তৃতীয় সর্বোচ্চ অর্থ পেয়েছে জার্মানির সফলতম ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া তাদের খেলোয়াড়দের সুবাদে ক্লাবটির আয় হয়েছে প্রায় ৩২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের জাতীয় দলে বায়ার্নের একাধিক ফুটবলার খেলেছেন। ফলে ক্লাবটির আয়ও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আয়ের তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে আর্সেনাল। ইংলিশ ক্লাবটি প্রায় ৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ পেয়েছে।
এছাড়া ভালো অঙ্কের অর্থ পেয়েছে—
- প্যারিস সাঁ জাঁ (পিএসজি)
- অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ
- ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড
এই ক্লাবগুলোর একাধিক তারকা ফুটবলার নিজ নিজ দেশের হয়ে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ায় ফিফার বেনিফিট তহবিল থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ এসেছে তাদের কোষাগারে।
বিশ্বের শীর্ষ ক্লাবগুলো প্রতি মৌসুমে খেলোয়াড়দের বেতন, ট্রান্সফার ফি এবং পরিচালন ব্যয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। সেই তুলনায় ফিফার দেওয়া এই অর্থ খুব বড় অঙ্ক নয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, বার্সেলোনা কিংবা বায়ার্ন মিউনিখের বার্ষিক বেতন ব্যয়ের তুলনায় এই আয় সামান্য অংশ মাত্র।
তবুও অতিরিক্ত এই অর্থ ক্লাবগুলোর আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হয়। বিশেষ করে দীর্ঘ মৌসুমে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের কারণে খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি বা চোটের ঝুঁকি বিবেচনায় এই ক্ষতিপূরণ গুরুত্বপূর্ণ।
যেখানে বড় ক্লাবগুলোর জন্য এই অর্থ তুলনামূলকভাবে ছোট অঙ্ক, সেখানে ছোট ও নিম্নস্তরের ক্লাবগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের সহায়তা।
কম বাজেটের ক্লাবগুলো এই অর্থ দিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, একাডেমি পরিচালনা কিংবা নতুন খেলোয়াড় গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিনিয়োগ করতে পারে।
২০২৬ বিশ্বকাপে এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ইংল্যান্ডের ষষ্ঠ স্তরের ক্লাব ব্রেইনট্রি টাউন। তুলনামূলক ছোট এই ক্লাবটিও ফিফার ক্লাব বেনিফিট প্রোগ্রামের আওতায় অর্থ পেয়েছে। তাদের মতো ক্লাবগুলোর জন্য এই অর্থ বাস্তবিক অর্থেই বড় প্রাপ্তি।
আধুনিক ফুটবলে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এবং ক্লাব ফুটবল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জাতীয় দলের সাফল্যের পেছনে যেমন ক্লাবগুলোর অবদান রয়েছে, তেমনি ক্লাবগুলোর আর্থিক স্বার্থ রক্ষায়ও ফিফা এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ক্লাব বেনিফিট প্রোগ্রাম সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে। এতে একদিকে ক্লাবগুলো আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় দলগুলোও বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সহজেই দলে পাচ্ছে।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ক্লাব বেনিফিট প্রোগ্রামের মাধ্যমে শত শত ক্লাব আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। আয় তালিকার শীর্ষে রয়েছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, এরপর বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখ। যদিও ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর জন্য এই অর্থ মোট বাজেটের তুলনায় খুব বেশি নয়, তবুও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা। অন্যদিকে ছোট ক্লাবগুলোর জন্য এই তহবিল উন্নয়ন ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বকাপের মাঠে ফুটবলারদের সাফল্যের পাশাপাশি তাই ক্লাবগুলোর আর্থিক হিসাবও সমান গুরুত্ব বহন করে।

