জাপানের রাজধানী টোকিওতে তীব্র গরমের কারণে অফিস সংস্কৃতিতে এসেছে এক ব্যতিক্রমী পরিবর্তন। কর্মীদের আরাম নিশ্চিত করতে পুরুষদের অফিসে ছোট হাফপ্যান্ট বা শর্টস পরে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। একদিকে পুরুষ কর্মীরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও অন্যদিকে অনেক নারী কর্মী এটিকে বৈষম্যমূলক বলে অভিযোগ তুলেছেন।
জুলাই মাসজুড়ে জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। অনেক জায়গায় পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করা কর্মীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার কর্মপরিবেশকে আরও আরামদায়ক করতে পুরুষ কর্মীদের অফিসে শর্টস পরার অনুমতি দিয়েছে। প্রশাসনের মতে, এতে কর্মীদের স্বস্তি যেমন বাড়বে, তেমনি অতিরিক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের প্রয়োজনও কমবে। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং পরিবেশ সংরক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই উদ্যোগটি টোকিও গভর্নর ইউরিকো কোইকের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘টোকিও কুল বিজ’ (Tokyo Cool Biz) অভিযানের অংশ। মূল লক্ষ্য হলো গ্রীষ্মকালে কর্মীদের আরাম নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয় আনা।
জাপানে দীর্ঘদিন ধরেই গরমের মৌসুমে অফিসের পোশাকবিধি কিছুটা শিথিল করার প্রচলন রয়েছে। আগে কর্মীদের টাই বা ভারী কোট না পরার পরামর্শ দেওয়া হলেও এবার প্রথমবারের মতো পুরুষদের শর্টস পরে অফিসে আসার অনুমতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনেক পুরুষ কর্মী জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে ফরমাল ট্রাউজার পরে দীর্ঘ সময় কাজ করা অত্যন্ত অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। শর্টস পরার সুযোগ পাওয়ায় তাঁরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
তাঁদের মতে, আরামদায়ক পোশাক কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। গরমের কারণে ক্লান্তি কমে এবং কাজে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। ফলে উৎপাদনশীলতাও বাড়তে পারে।
তবে এই সিদ্ধান্ত সবাই ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেননি। অনেক নারী কর্মী প্রশ্ন তুলেছেন, যদি পুরুষদের পোশাকবিধিতে এতটা ছাড় দেওয়া যায়, তাহলে নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বাধীনতা কেন থাকবে না?
তাঁদের অভিযোগ, এখনো অনেক অফিসে নারী কর্মীদের জন্য টাইট পোশাক, লম্বা স্কার্ট বা নির্দিষ্ট ধরনের ফরমাল ড্রেস পরার অলিখিত চাপ রয়েছে। প্রচণ্ড গরমেও সেই নিয়ম থেকে তারা মুক্তি পান না।
ফলে অনেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত প্রকৃত অর্থে সমতা নিশ্চিত না করে বরং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ‘লেগ হেয়ার হ্যারাসমেন্ট’।
কিছু নারী কর্মীর দাবি, শর্টস পরার ফলে পুরুষদের পায়ের লোম সারাক্ষণ দৃশ্যমান থাকে, যা তাঁদের কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
যদিও অনেকেই এই অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেছেন, তবুও এটি কর্মক্ষেত্রে পোশাক, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নারী অধিকারকর্মী ও কর্মজীবী নারীদের একাংশ মনে করছেন, অফিসের পোশাকবিধি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত।
তাঁদের বক্তব্য, যদি পুরুষরা আবহাওয়ার কারণে আরামদায়ক পোশাক পরতে পারেন, তাহলে নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নমনীয়তা থাকা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য পোশাকবিধি লিঙ্গনির্ভর না হয়ে পরিস্থিতিনির্ভর হওয়া উচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্ম আরও দীর্ঘ এবং তীব্র হয়ে উঠছে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য পোশাকবিধি পুনর্বিবেচনা করছে।
আগে যেখানে কঠোর ফরমাল পোশাককে পেশাদারিত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, এখন অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আরামদায়ক পোশাক মানসিক চাপ কমাতে এবং কর্মদক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
টোকিওর এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ মনে করছেন, শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য আলাদা সুবিধা দেওয়া সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, পোশাকের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্য একই ধরনের নমনীয় নীতি প্রণয়ন করা হলে বিতর্কের সুযোগ অনেকটাই কমে যেত।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে অফিসের প্রচলিত ড্রেস কোডে আরও পরিবর্তন আসতে পারে। কর্মীদের স্বাস্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য এবং উৎপাদনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই নতুন নীতিমালা গ্রহণ করছে।
টোকিওর এই সিদ্ধান্ত হয়তো ভবিষ্যতের কর্মসংস্কৃতির একটি নতুন দিক নির্দেশ করছে। তবে একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কর্মক্ষেত্রে সমতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং পেশাদার পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচণ্ড গরমে কর্মীদের স্বস্তি দিতে টোকিও প্রশাসনের শর্টস পরার অনুমতি নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নারী-পুরুষের পোশাকবিধি, কর্মক্ষেত্রে সমতা এবং ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে নতুন বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সব কর্মীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হলে বিতর্ক কমবে এবং কর্মপরিবেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠতে পারে।

