বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে ঘিরে উন্মাদনা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং টুর্নামেন্টের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মারকগুলোকেও ঘিরে তৈরি হয় বিশাল আকর্ষণ। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্বখ্যাত নিলাম প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টিজ, গ্লোবাল সিটিজেন এবং ফিফার যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করেছে এক বিশেষ দাতব্য নিলাম। নিলাম শেষ হতে এখনো কয়েক দিন বাকি থাকলেও ইতোমধ্যেই কিছু স্মারক সংগ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় চমক হলো, ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির অটোগ্রাফ দেওয়া জার্সিকেও মূল্যের দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় কে-পপ ব্যান্ড বিটিএসের সদস্য জিমিনের ব্যবহৃত একটি পোশাক। এতে স্পষ্ট হয়েছে, বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতি এবং ফুটবলের জনপ্রিয়তা এক নতুন মাত্রায় মিলিত হয়েছে।
‘ওয়ান গোল: অ্যান অকশন টু বেনিফিট দ্য ফিফা গ্লোবাল সিটিজেন এডুকেশন ফান্ড’ শিরোনামে আয়োজিত এই নিলামে বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট ৪০টিরও বেশি মূল্যবান স্মারক রাখা হয়েছে। ২৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন।
নিলামের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ফিফার গ্লোবাল সিটিজেন এডুকেশন ফান্ডে দেওয়া হবে। এই তহবিলের মাধ্যমে বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং ফুটবলের প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
মানবিক এই উদ্যোগের কারণে নিলামটি শুধু সংগ্রাহকদের কাছেই নয়, সামাজিক উন্নয়নেও আগ্রহী মানুষের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এবারের নিলামে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ কাড়ছে বিটিএস সদস্য জিমিনের ব্যবহৃত পোশাক। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবার অনুষ্ঠিত হাফটাইম শোতে পারফর্ম করার সময় তিনি এই পোশাকটি পরেছিলেন।
এখন পর্যন্ত এই পোশাকটির জন্য সর্বোচ্চ ১৪ হাজার মার্কিন ডলার দর উঠেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার সমান।
নিলাম এখনও শেষ হয়নি। ফলে শেষ মুহূর্তে এই মূল্য আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসির অটোগ্রাফ দেওয়া জার্সিটিও নিলামে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে জিমিনের পোশাকের তুলনায় এর মূল্য অনেকটাই কম।
বর্তমানে মেসির জার্সির জন্য সর্বোচ্চ ৬ হাজার ডলার দর উঠেছে। একই পরিমাণ মূল্য উঠেছে বিশ্বখ্যাত পপ তারকা ম্যাডোনার ব্যবহৃত গ্লাভসের জন্যও।
ফলে মূল্য তালিকায় যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এই দুটি স্মারক।
যদিও নিলাম শেষ হওয়ার আগে দর আরও বাড়তে পারে, তবুও বর্তমান ব্যবধান বিবেচনায় জিমিনের পোশাকই সবচেয়ে দামি স্মারক হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। কারণ এবারই প্রথমবারের মতো সুপার বোলের আদলে বিশ্বকাপ ফাইনালে আয়োজন করা হয় হাফটাইম শো।
এই বিশেষ আয়োজনে অংশ নেন বিশ্বের জনপ্রিয় কয়েকজন সংগীতশিল্পী। বিটিএসের জিমিন ছাড়াও মঞ্চ মাতান শাকিরা, ম্যাডোনা এবং জাস্টিন বিবারের মতো আন্তর্জাতিক তারকারা।
ফুটবল এবং বৈশ্বিক বিনোদন শিল্পকে একই মঞ্চে নিয়ে আসার এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে দর্শকদের দারুণ সাড়া পেয়েছে। সেই কারণেই এই অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত পোশাক ও সামগ্রীগুলোর মূল্য সংগ্রাহকদের কাছে অনেক বেশি।
শুধু জিমিন বা মেসির স্মারকই নয়, নিলামে রাখা হয়েছে আরও অনেক ঐতিহাসিক সংগ্রহযোগ্য সামগ্রী।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্যবহৃত ম্যাচ বল।
- স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফাইনাল ম্যাচের স্মারক সামগ্রী।
- বিভিন্ন জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অটোগ্রাফ দেওয়া জার্সি।
- শাকিরার হাফটাইম শোতে ব্যবহৃত পোশাক।
- বিটিএসের অন্যান্য সদস্যদের ব্যবহৃত পোশাক।
- ম্যাডোনার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগ্রহযোগ্য সামগ্রী।
এসব স্মারকের অনেকগুলোর মূল্যও শেষ মুহূর্তে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন নিলাম বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ।
প্রথমত, বিটিএস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতদল। তাদের সদস্যদের ব্যবহৃত যেকোনো স্মারকের প্রতি সংগ্রাহকদের আগ্রহ সবসময়ই বেশি থাকে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম হাফটাইম শো ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। ফলে সেই অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত পোশাকের ঐতিহাসিক মূল্যও অনেক বেড়ে গেছে।
তৃতীয়ত, ফুটবলপ্রেমী ও কে-পপ ভক্ত—দুই বিশাল শ্রেণির মানুষের আগ্রহ একই স্মারকে একত্রিত হওয়ায় এর বাজারমূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই নিলামের মূল উদ্দেশ্য শুধু বিরল স্মারক বিক্রি নয়; বরং শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা।
গ্লোবাল সিটিজেন জানিয়েছে, নিলাম থেকে প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংগৃহীত অর্থ বিশ্বের পিছিয়ে থাকা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, খেলাধুলার উন্নয়ন এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিমূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে।
এভাবে ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশ্বখ্যাত নিলাম প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টিজ এর আগেও একাধিক ঐতিহাসিক নিলামের আয়োজন করেছে।
সম্প্রতি এনএফএল দলের প্রয়াত মালিক ও সমাজসেবক জিম আরসের সংগ্রহ থেকে শত শত স্মারক বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাস গড়ে। পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত সেই নিলামে ৪০৪টি বিরল স্মারক বিক্রি হয় এবং প্রায় ৩০টি নতুন নিলাম রেকর্ড তৈরি হয়।
সেই আয়োজন থেকে মোট ১০ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছিল। তার এক মাসের মধ্যেই বিশ্বকাপ স্মারক নিয়ে নতুন এই দাতব্য নিলাম শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংগ্রাহকদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, আধুনিক ক্রীড়া আয়োজন এখন শুধু প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবল, সংগীত, সংস্কৃতি এবং মানবকল্যাণ—সবকিছুকে একত্রিত করে বৈশ্বিক দর্শকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব।
জিমিনের পোশাকের প্রতি অভূতপূর্ব আগ্রহ সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। যেখানে একজন ফুটবল কিংবদন্তির অটোগ্রাফ দেওয়া জার্সিকেও মূল্যের দিক থেকে ছাড়িয়ে যেতে পারে একজন বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পীর ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সে ব্যবহৃত পোশাক।
নিলামের শেষ দিনে দর কোথায় গিয়ে থামবে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা। তবে ইতোমধ্যেই এই আয়োজন বিশ্বকাপ স্মারকের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত দাতব্য নিলাম হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।

