চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন কিছু নয়। এক সময় স্টেথোস্কোপ, এক্স-রে, এমআরআই কিংবা রোবোটিক সার্জারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। এখন সেই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত সংযোজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো ভারতেও চিকিৎসাক্ষেত্রে দ্রুত বাড়ছে এআই-এর ব্যবহার। রোগ নির্ণয়, প্রেসক্রিপশন তৈরি, রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণা কিংবা প্রশাসনিক কাজ—সব ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের নতুন সহকারী হয়ে উঠছে এই প্রযুক্তি।
কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির মাঝেই সামনে এসেছে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা। চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তি এবং পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের কারণে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁরা পেশা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আশঙ্কা করছেন, ২০৩০ সালের আগেই তাঁরা বর্তমান পেশা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হতে পারেন।
গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্যসেবায় এআই-এর ব্যবহার চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। আগে যেখানে এই প্রযুক্তি মূলত গবেষণা বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা চিকিৎসকদের দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে উঠছে।
‘ক্লিনিশিয়ান অফ দ্য ফিউচার ২০২৬’ শীর্ষক সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে প্রায় ৪৮ শতাংশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী তাঁদের পেশাগত কাজে এআই ব্যবহার করছেন। মাত্র এক বছর আগেও এই হার ছিল ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ, অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এআই-এর মাধ্যমে রোগীর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি তৈরি, রিপোর্ট সংক্ষেপ করা, গবেষণার তথ্য সংগ্রহ এবং প্রশাসনিক কাজ অনেক দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে চিকিৎসকদের মূল্যবান সময় বাঁচছে এবং রোগী দেখার জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এআই ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়লেও চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ এখনও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি। এই বিষয়টিকেই বিশেষ উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মাত্র ৪৫ শতাংশ মনে করেন, তাঁরা এআই ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। আরও কম, মাত্র ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন যে তাঁরা উন্নত মানের এআই শিক্ষা বা দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন।
সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেই। মাত্র ১৮ শতাংশ চিকিৎসক বিশ্বাস করেন, তাঁরা এআই ব্যবহারে পর্যাপ্তভাবে প্রশিক্ষিত। অন্যদিকে প্রায় ৪৬ শতাংশ নার্স মনে করেন, তাঁরা এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, সেই গতিতে চিকিৎসকদের দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
প্রযুক্তির উন্নতি সাধারণত কাজকে সহজ করে। কিন্তু চিকিৎসাক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন।
এআই চিকিৎসকদের অনেক প্রশাসনিক কাজ কমিয়ে দিলেও, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ, আইনি দায়বদ্ধতা এবং দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানোর চাপ অনেক চিকিৎসকের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে প্রায় ৭ জন মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০৩০ সালের আগেই তাঁরা পেশা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এই প্রবণতার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে—
- দীর্ঘ সময় ধরে কাজের চাপ
- পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব
- মানসিক অবসাদ ও বার্নআউট
- প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপ
- পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব
- প্রশাসনিক দায়িত্বের ক্রমবর্ধমান চাপ
উদ্বেগ থাকলেও চিকিৎসকেরা এআই-এর সম্ভাবনাকে অস্বীকার করছেন না। বরং অধিকাংশই মনে করেন, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত করতে পারে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে—
- ৭৫ শতাংশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী বিশ্বাস করেন, এআই রোগীর চিকিৎসার মান বাড়াতে সাহায্য করবে।
- ৫০ শতাংশের মতে, এআই ইতিমধ্যেই তাঁদের কাজকে আরও কার্যকর করেছে।
বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতে এআই ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ চিকিৎসা-উপযোগী বিশেষায়িত এআই সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে ৫৬ শতাংশ সাধারণ এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নথিপত্র তৈরি, তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা এবং প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করছেন।
অর্থাৎ, এআই এখন শুধু গবেষণাগারের প্রযুক্তি নয়; এটি চিকিৎসকদের প্রতিদিনের কর্মজীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
এআই নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন হলো—একদিন কি চিকিৎসকের জায়গা নেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা?
এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু চিকিৎসকদের বড় অংশই নেতিবাচকভাবে দিয়েছেন।
সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী মনে করেন, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে এআই চিকিৎসকের বিকল্প হবে না। বরং এটি একজন দক্ষ সহকারী হিসেবে কাজ করবে।
তাঁদের মতে, এআই রোগীর তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে, সম্ভাব্য রোগ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে কিংবা রিপোর্ট তৈরি করতে পারে। কিন্তু রোগীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, শারীরিক পরীক্ষা, জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা এখনও চিকিৎসকেরই কাজ।
শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হয় না, সেটি ব্যবহার করার মতো পরিবেশও দরকার।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া মাত্র ৪১ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত ডিজিটাল পরিকাঠামো রয়েছে।
চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম। মাত্র ৩০ শতাংশ চিকিৎসক মনে করেন, তাঁদের কর্মস্থলে পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা রয়েছে।
অন্যদিকে ৫১ শতাংশ নার্স তুলনামূলকভাবে ভালো প্রযুক্তিগত সহায়তার কথা জানিয়েছেন।
এটি বোঝায় যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তিগত বৈষম্য এখনও উল্লেখযোগ্য।
এআই ব্যবহারের সঙ্গে নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তার বিষয়ও জড়িত। রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং ভুল সিদ্ধান্তের দায়িত্ব কার—এসব প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী মনে করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের জন্য যথাযথ নীতিমালা, তদারকি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়া ৩৫ শতাংশ এআই-এর ওপর উচ্চমাত্রার আস্থা প্রকাশ করেছেন। ৫৭ শতাংশ মাঝারি মাত্রায় আস্থা রাখেন।
অর্থাৎ, চিকিৎসকেরা প্রযুক্তিকে স্বাগত জানালেও সম্পূর্ণভাবে তার ওপর নির্ভর করতে এখনও প্রস্তুত নন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক সিদ্ধান্তই শুধু তথ্য বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে না। রোগীর পারিবারিক ইতিহাস, মানসিক অবস্থা, জীবনযাত্রা, সামাজিক পরিস্থিতি এবং চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এআই বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু রোগীর চোখের ভাষা, উদ্বেগ কিংবা পারিবারিক বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনও মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এই কারণেই অধিকাংশ চিকিৎসক মনে করেন, ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবায় এআই হবে সহযোগী, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়।
সমীক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চিকিৎসকদের মানসিক সুস্থতা। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, যদি কর্মপরিবেশে চাপ কমানো না যায়, তাহলে দক্ষ জনবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, কর্মঘণ্টার ভারসাম্য, আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এসব উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে দক্ষ চিকিৎসকের সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে—এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রায় কোনো দ্বিমত নেই। তবে প্রযুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে সেটি কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং চিকিৎসকদের কতটা প্রস্তুত করা যাচ্ছে তার ওপর।
শুধু নতুন সফটওয়্যার বা আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করলেই স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, উন্নত ডিজিটাল পরিকাঠামো, স্পষ্ট নীতিমালা এবং মানসিক চাপ কমানোর কার্যকর উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি দ্বিমুখী বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। একদিকে এআই চিকিৎসকদের কাজকে দ্রুত, সহজ ও আরও কার্যকর করে তুলছে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের অভাব চিকিৎসকদের পেশাগত অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এআই-এর ভবিষ্যৎ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসকদের নিরাপদ, দক্ষ এবং মানসিকভাবে সুস্থ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রযুক্তি ও মানুষের এই ভারসাম্যই আগামী দিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।

