বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনা মানেই আত্মবিশ্বাস, প্রতিভা এবং বড় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ ক্ষমতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ছে—গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছে না লিওনেল মেসিদের দল। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও বারবার গোল হজম করে ম্যাচ কঠিন করে তোলার প্রবণতা সমর্থকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
কাবো ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচেও সেই একই দৃশ্য দেখা গেছে। দুইবার এগিয়ে গিয়েও দুইবারই সমতা ফিরিয়েছে প্রতিপক্ষ। শেষ পর্যন্ত জয় এলেও ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। এটি কি শুধুই সাময়িক ভুল, নাকি দলের গভীরে লুকিয়ে থাকা কৌশলগত কিংবা মানসিক সমস্যার ইঙ্গি
এই ধরনের পরিস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। কাতার বিশ্বকাপেও একাধিক ম্যাচে এগিয়ে গিয়ে গোল হজম করেছিল আর্জেন্টিনা।
প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও ২-১ ব্যবধানে হারতে হয়েছিল। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-০ লিড নিয়েও শেষ পর্যন্ত ২-২ সমতায় পৌঁছে যায় ম্যাচ। টাইব্রেকারে জিতে সেমিফাইনালে উঠতে হয়।
সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে ফাইনালে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। যদিও শেষ হাসি হেসেছিল আর্জেন্টিনাই।
কাবো ভার্দের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ম্যাচ সেই স্মৃতিকেই যেন আবার ফিরিয়ে আনল।
ম্যাচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গোল করার পর আর্জেন্টিনা অনেক সময় খেলার গতি কমিয়ে দেয়। আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে সরে এসে তারা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে।
কাবো ভার্দের বিপক্ষেও ঠিক এমনটাই হয়েছে। প্রথম গোলের পর আর্জেন্টিনা কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় গোলের পরও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ফলে প্রতিপক্ষ আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় এবং আক্রমণের সুযোগ তৈরি করতে থাকে।
ম্যাচ শেষে কোচ লিওনেল স্কালোনি স্বীকার করেছেন, দলকে শারীরিকভাবে অনেক ধকল সহ্য করতে হচ্ছে। ঘন ঘন ম্যাচ, কম বিশ্রাম এবং টুর্নামেন্টের কঠিন সূচি খেলোয়াড়দের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা কয়েকটি কঠিন ম্যাচ খেলতে হলে শক্তি বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিকল্পনা যদি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি উল্টো দলের জন্যই সমস্যা তৈরি করে।
অনেক সময় ৯০ মিনিটে সহজে শেষ করা সম্ভব ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে খেলোয়াড়দের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।
শুধু ক্লান্তিকে দায় দিলে পুরো চিত্রটি ব্যাখ্যা করা যায় না।
আর্জেন্টিনার খেলার ধরন ইউরোপের অনেক দলের চেয়ে আলাদা। তারা পুরো ম্যাচজুড়ে সমান তালে উচ্চ গতির প্রেসিং ফুটবল খেলে না। বরং নির্দিষ্ট সময় আক্রমণের গতি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে।
লিওনেল মেসিও ম্যাচ শেষে সেই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষ বলের দখল বেশি রেখেছে এবং মাঝমাঠে অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড় রাখায় আর্জেন্টিনা চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে পুরো ম্যাচজুড়ে তাদের বেশি দৌড়াতে হয়েছে।
এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, সমস্যা কেবল শারীরিক নয়, কৌশলগতও।
আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় শক্তি হলো হঠাৎ গতিবৃদ্ধি করে আক্রমণ সাজানো।
কাবো ভার্দের বিপক্ষে প্রথম গোলটিও এসেছিল এমনই একটি দ্রুত আক্রমণ থেকে। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত পাস ধরে মেসির গোল ছিল পরিকল্পিত ও চমৎকার সমন্বয়ের ফল।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন প্রতিপক্ষ নিজেদের আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। তখন আর্জেন্টিনা অনেক সময় অযথা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে। এতে প্রতিপক্ষ বলের দখল বাড়ায় এবং গোলের সুযোগও তৈরি করে।
রক্ষণভাগে আর্জেন্টিনা খুব দুর্বল নয়। তবে সাম্প্রতিক ম্যাচে বল ক্লিয়ার করার ক্ষেত্রে ধীরগতি চোখে পড়েছে।
প্রতিপক্ষ যখন বক্সের আশপাশে চাপ সৃষ্টি করে, তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কিন্তু কাবো ভার্দের বিপক্ষে সেই জায়গাতেই ভুল করেছে আর্জেন্টিনা।
ফলে প্রতিপক্ষ সহজেই জায়গা বের করে গোল করতে সক্ষম হয়েছে। দুয়ার্তে এবং সিডনি লোপেজের গোল দুটি সেই রক্ষণগত দুর্বলতারই উদাহরণ।
আর্জেন্টিনার হাতে বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগ রয়েছে। তারপরও তারা অনেক সময় কার্যকর কাউন্টার অ্যাটাক খেলতে পারে না।
বর্তমান সময়ে মেসির বয়স এবং শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন। প্রতিটি দ্রুত আক্রমণের সূচনা তাঁর পা থেকেই হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
এই জায়গায় লাউতারো মার্তিনেজ এবং জুলিয়ান আলভারেজকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের গতিময় দৌড় এবং ফিনিশিং দক্ষতা প্রতিপক্ষের রক্ষণকে আরও বেশি চাপে ফেলতে পারে।
সমালোচনার মাঝেও আর্জেন্টিনার কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্ট হয়েছে।
দুইবার গোল হজম করার পরও দলটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েনি। বরং দ্রুত ম্যাচে ফিরে এসেছে এবং বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
সেট-পিস থেকেও দুই সেন্টারব্যাক গোল করেছেন, যা প্রমাণ করে আর্জেন্টিনার আক্রমণ কেবল মেসিনির্ভর নয়। বিভিন্ন উপায়ে গোল করার সক্ষমতা এখনও দলটির বড় শক্তি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চাপের মুহূর্তেও খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের ভাটা দেখা যায়নি।
শিরোপা জিততে হলে শুধু ম্যাচ জেতাই যথেষ্ট নয়; ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও থাকতে হবে।
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন গোল করার পর একই আগ্রাসন ধরে রাখা। প্রতিপক্ষকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ না দিয়ে বলের দখল ও আক্রমণের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
শারীরিক ক্লান্তি, কৌশলগত পরিবর্তন এবং মানসিক মনোযোগ—এই তিনটি বিষয়েই উন্নতি আনতে পারলে আর্জেন্টিনা আরও ভয়ংকর দলে পরিণত হতে পারে।
কাবো ভার্দের বিপক্ষে জয় পেলেও আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স স্পষ্ট করে দিয়েছে, দলের কিছু পুরনো সমস্যা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। এগিয়ে গিয়ে গোল হজম করার প্রবণতা ভবিষ্যতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বড় মূল্য চোকাতে বাধ্য করতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, এই দলটি এখনও কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ মানসিক শক্তি রাখে। এখন প্রয়োজন ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই তীব্রতা বজায় রাখা। যদি সেটি সম্ভব হয়, তাহলে আর্জেন্টিনা আবারও বড় শিরোপার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

