তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা ও সতেজ রাখতে অনেকেরই পছন্দ ডাবের পানি। প্রাকৃতিক এই পানীয়তে বিভিন্ন ধরনের খনিজ উপাদান থাকায় সুস্থ মানুষের জন্য এটি বেশ উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে গরমে ঘামের পর শরীরকে কিছুটা সতেজ করতে ডাবের পানি জনপ্রিয় একটি পানীয়।
তবে ডাবের পানি সব মানুষের জন্য সমানভাবে উপকারী নয়। বিশেষ করে কিডনির সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি পান করার আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ ডাবের পানিতে পটাশিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করলে শরীর থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পটাশিয়াম বের হয়ে যেতে বাধাগ্রস্থ হতে পারে। এর জন্য রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ডায়রিয়া, বমি কিংবা অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে গেলে শুধু ডাবের পানি পান করলেই পানিশূন্যতা পুরোপুরি পূরণ হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট অনুপাতে তৈরি খাবার স্যালাইন বা ওআরএস (ORS) বেশি কার্যকর হতে পারে।
ডাবের পানি একটি প্রাকৃতিক ভাবে পাওয়া পানীয়। এ পানিতে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ক্লোরাইডসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান রযেছে। সাথে সাথে এতে ভিটামিন সি, অ্যামিনো অ্যাসিড ও কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে।
গরমের সময় শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে কিছু পানি ও খনিজ উপাদান বেরিয়ে যায়। এ সময় সুস্থ একজন মানুষ পরিমিত পরিমাণে ডাবের পানি পান করলে শরীরে তরল যোগ হতে পারে এবং সতেজ অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
অনেকে হালকা ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রমের পরও ডাবের পানি পান করে থাকে। এটি সকল ধরনের পানিশূন্যতার চিকিৎসা নয়। শরীর থেকে কি পরিমান পানি ও কোন কোন ইলেক্ট্রোলাইট হারিয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে কোন পানীয় প্রয়োজন।
কিডনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শরীরের অতিরিক্ত পানি ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থের ভারসাম্য বজায় রাখা। রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিডনি যখন স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না, তখন শরীরে পটাশিয়াম জমে যেতে পারে। একে হাইপারক্যালেমিয়া বলা হয়। রক্তে পটাশিয়াম অতিরিক্ত বেড়ে গেলে হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডাবের পানিতে পটাশিয়াম থাকায় দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বা যাদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি, তাদের জন্য অতিরিক্ত ডাবের পানি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাই কিডনি রোগী হলেই যে একেবারেই ডাবের পানি পান করা যাবে না, বিষয়টি এমন নয়। ব্যক্তির কিডনির কার্যক্ষমতা, রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা, অন্যান্য রোগ এবং চিকিৎসকের দেওয়া খাদ্যতালিকার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। কারও ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণে অনুমোদিত হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে পুরোপুরি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
অতিরিক্ত বমি বা ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে শুধু পানি নয়, সোডিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেক্ট্রোলাইটও বের হয়ে যায়। এ কারনে দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ওআরএস বা খাবার স্যালাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক অনুপাতে তৈরি ওআরএসে পানি, সোডিয়াম, গ্লুকোজ এবং প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইট থাকে। গ্লুকোজ ও সোডিয়ামের নির্দিষ্ট সমন্বয় অন্ত্রে পানি শোষণে সহায়তা করে। ফলে শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণে এটি কার্যকর।
ডাবের পানিতেও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। কিন্তু এর উপাদানের অনুপাত ওআরএসের মতো পানিশূন্যতার চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত নয়। বিশেষ করে শরীর থেকে বেশি পরিমাণে সোডিয়াম ও পানি বেরিয়ে গেলে শুধু ডাবের পানি সেই ঘাটতি যথেষ্ট পরিমাণে পূরণ করতে নাও পারে।
তাই ডায়রিয়া, বমি বা অতিরিক্ত তরল ক্ষয়ের ক্ষেত্রে ডাবের পানিকে খাবার স্যালাইনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ডায়রিয়া বা বমির সময় ওআরএস খাওয়ার ক্ষেত্রে প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিষ্কার পানিতে পুরো প্যাকেটের স্যালাইন মিশিয়ে নিতে হবে।
কম বা বেশি পানি দিয়ে স্যালাইন তৈরি করলে এর উপাদানের ঘনত্ব ঠিক নাও থাকতে পারে। আবার তৈরি করা স্যালাইন দীর্ঘ সময় রেখে পান করাও ঠিক নয়। তাই প্রস্তুত করার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা ব্যবহার করা এবং বাকি থাকলে নতুন করে তৈরি করা নিরাপদ।
বারবার বমি হলেও একবারে বেশি পরিমাণে না খেয়ে অল্প অল্প করে ওআরএস পান করার চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে ঘরে বসে শুধু স্যালাইনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
সুস্থ মানুষের জন্য ডাবের পানি পরিমিত পরিমাণে একটি ভালো প্রাকৃতিক পানীয় হতে পারে। প্রচণ্ড গরমে শরীর সতেজ রাখতে এটি পান করা যায়। হালকা শারীরিক পরিশ্রমের পরও অনেকে এটি পান করে থাকেন।
তবে ডাবের পানি পান করলেই শরীরের সব ধরনের পানির ও লবণের ঘাটতি পূরণ হবে এমন ধারণা ঠিক নয়। সাধারণ তৃষ্ণা বা দৈনন্দিন হাইড্রেশনের জন্য স্বাভাবিক পানি সবচেয়ে সহজ ও প্রয়োজনীয় পানীয়।
অন্যদিকে ডায়রিয়া, বমি কিংবা অতিরিক্ত ঘামের কারণে যখন শরীর থেকে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইটের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষয় হয়, তখন পরিস্থিতি অনুযায়ী ওআরএসের প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ডাবের পানি নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, যাদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি, কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেছে অথবা চিকিৎসক পটাশিয়ামযুক্ত খাবার সীমিত করতে বলেছেন তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
এ ছাড়া কিছু হৃদ্রোগী বা নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ সেবনকারীর ক্ষেত্রেও রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই নিজের শারীরিক অবস্থা না জেনে অতিরিক্ত ডাবের পানি পান করা উচিত নয়।
বিশেষ করে কিডনি রোগীদের খাদ্যতালিকা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। একজন রোগীর জন্য যে পরিমাণ পটাশিয়াম গ্রহণ নিরাপদ, অন্য রোগীর জন্য সেটি নিরাপদ নাও হতে পারে।
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত বা বোতলজাত ডাবের পানিও পাওয়া যায়। এগুলো কেনার সময় শুধু ‘coconut water’ লেখা দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
পণ্যের লেবেলে চিনি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম এবং অন্যান্য উপাদানের পরিমাণ দেখে নেওয়া ভালো। কিছু প্যাকেটজাত পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি বা অন্যান্য উপাদান যোগ করা থাকতে পারে।
তাজা ডাবের পানির সঙ্গে প্যাকেটজাত পানীয়ের পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য এক নাও হতে পারে। তাই বিশেষ খাদ্যনিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লেবেল পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কোনো খাবার বা পানীয় উপকারী হলেই তা যত বেশি খাওয়া হবে, তত বেশি উপকার পাওয়া যাবে এমন নয়। ডাবের পানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সুস্থ ব্যক্তি সাধারণত পরিমিত পরিমাণে ডাবের পানি পান করতে পারেন। কিন্তু অপ্রয়োজনে বারবার বা অতিরিক্ত পরিমাণে পান করার প্রয়োজন নেই।
একইভাবে শরীরে পানিশূন্যতা না থাকলে নিয়মিত খাবার স্যালাইন পান করারও দরকার নেই। ওআরএস মূলত শরীর থেকে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক পানরে তৃষ্ণা, প্রস্রাবের চাপ কমে যাওয়া, চোখের নিচে বসে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা ঘন ঘন বমির মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু ডাবের পানি বা ঘরোয়া পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। রোগীর পানিশূন্যতা বেশি হলে হাসপাতালে চিকিৎসা ও শিরায় তরল দেওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ডাবের পানি ও খাবার স্যালাইনের উদ্দেশ্য এক নয়। ডাবের পানি মূলত একটি প্রাকৃতিক তরল, যাতে বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। সুস্থ মানুষের দৈনন্দিন তরল গ্রহণের অংশ হিসেবে এটি উপকারী হতে পারে।
অন্যদিকে ডায়রিয়া, বমি বা অতিরিক্ত তরল ক্ষয়ের কারণে পানিশূন্যতা তৈরি হলে ওআরএস নির্দিষ্ট অনুপাতে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট সরবরাহ করে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে খাবার স্যালাইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
বিশেষ করে কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে ডাবের পানি নিয়ে একটু বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ এতে থাকা পটাশিয়াম কিছু রোগীর জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই কিডনি রোগী, রক্তে পটাশিয়াম বেশি থাকা ব্যক্তি কিংবা পটাশিয়াম গ্রহণে চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এমন কেউ ডাবের পানি পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
শরীরের প্রয়োজন বুঝে সঠিক পানীয় বেছে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তৃষ্ণা মেটাতে সাধারণ পানি, স্বাভাবিক অবস্থায় পরিমিত ডাবের পানি এবং ডায়রিয়া-বমিজনিত পানিশূন্যতায় প্রয়োজন অনুযায়ী ওআরএস প্রতিটি পানীয়ের ব্যবহার আলাদা। তাই একটির জায়গায় অন্যটিকে ব্যবহার না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তথ্য সূত্র: এনডিটিভি

