বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। তবে আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিয়োনেল মেসিকে কেন্দ্র করে একাধিক সম্ভাব্য হামলার হুমকির তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশের একটি কথিত গোপন রিপোর্টের কিছু অংশ প্রকাশ্যে আসার পর জানা যাচ্ছে, বিশ্বকাপ চলাকালীন মেসি, আর্জেন্টিনা দল, অন্যান্য দলের খেলোয়াড়, ফিফার কর্মকর্তা এবং ম্যাচ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে একাধিক হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া নথির দাবি অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলিকে ঘিরে বিশেষভাবে সতর্ক ছিল মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। একাধিক হুমকি পাওয়ার পর মেসি এবং তাঁর সতীর্থদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছিল।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ মেসি। তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তার কারণেই তাঁকে সম্ভাব্য হামলার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে ফাঁস হওয়া রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
আর্জেন্টিনা দলের পাশাপাশি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অন্য দল, ফিফার কর্মকর্তা, রেফারি এবং পুলিশকেও হুমকির আওতায় রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
বিশ্বকাপের মতো বিশাল আন্তর্জাতিক আসরে একই সঙ্গে বহু দেশের খেলোয়াড় ও দর্শকের উপস্থিতি থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এমন হুমকি বাড়তি চাপ তৈরি করে।
প্রকাশিত রিপোর্টের দাবি অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে গুরুতর হুমকি এসেছিল।
এক ব্যক্তি ফোন করে দাবি করেছিলেন, তিনি আরও কয়েকজনের সঙ্গে স্টেডিয়ামে ঢুকে হামলা চালাবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মেসি-সহ আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তারাই থাকবেন মূল লক্ষ্য।
হুমকিদাতা পুলিশকেও হামলার আওতায় রাখার কথা জানিয়েছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। স্টেডিয়াম ও দলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও কড়া করা হয়।
আর্জেন্টিনার আরেকটি ম্যাচের আগেও আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। সামাজিক মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মেসিকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরণের হুমকি দেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেডিয়ামের ভেতরে বিস্ফোরক থাকার বিষয়ে পুলিশকে ফোন করে সতর্ক করা হয়।
ফলে ম্যাচ শুরুর আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়। সন্দেহজনক জায়গা ও স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখে নিরাপত্তাকর্মীরা।
একাধিক হুমকি আসতে থাকায় বিষয়টি শুধু স্থানীয় পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মার্কিন প্রশাসন ফেডারেল তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই-কেও তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সহায়তাও নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, কোন হুমকি বাস্তব এবং কোনটি শুধুই আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে করা—তা দ্রুত চিহ্নিত করা।
হুমকির তালিকায় শুধু মেসি ছিলেন না। বিশ্বের আরেক মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর নিরাপত্তাও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ফিফার এক কর্মীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি রোনাল্ডো কখন, কোথায় থাকবেন—এই ধরনের তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। সরাসরি হুমকি না থাকলেও বিষয়টিকে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে গুরুত্ব দিয়ে পুলিশকে জানানো হয়।
এর পর রোনাল্ডোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল।
বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় একই সময়ে একাধিক শহরে ম্যাচ আয়োজন হয়। হাজার হাজার দর্শক, খেলোয়াড়, কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক অতিথির উপস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশাল দায়িত্ব।
এর মধ্যে যদি কোনও নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হুমকি আসে, তাহলে নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে আরও কঠোর করতে হয়।
মেসির ক্ষেত্রে তাঁর অতিরিক্ত জনপ্রিয়তা এবং বিপুল জনসমাগমের বিষয়টি নিরাপত্তা সংস্থাগুলির জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল বলেই মনে করা হচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। প্রকাশিত তথ্যগুলি মূলত হুমকি ও সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা সংক্রান্ত রিপোর্টের দাবি। কোনও হুমকি পাওয়া মানেই হামলাকারীরা বাস্তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল—এমন নয়।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলি সাধারণত এ ধরনের প্রতিটি হুমকিকেই গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করে। কারণ, একটি হুমকি ভুয়ো হলেও সেটিকে উপেক্ষা করলে প্রকৃত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ফাঁস হওয়া রিপোর্টের তথ্যও তাই তদন্ত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্ব ফুটবলে মেসির জনপ্রিয়তা অভূতপূর্ব। যে কোনও স্টেডিয়ামে তাঁর উপস্থিতি বিপুল দর্শক আকর্ষণ করে। ফলে কোনও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা হামলাকারী যদি বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করতে চায়, তাহলে মেসির মতো বিশ্বপরিচিত ব্যক্তিত্বকে প্রতীকী লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য বা হুমকিদাতাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে তদন্তের তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

