খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeইতিহাস-ঐতিহ্য৮৬ মৌজা নিলামে বিক্রি করেও ফেরাতে হয়েছিল! পঞ্চকোট রাজপরিবারের অজানা ইতিহাস

৮৬ মৌজা নিলামে বিক্রি করেও ফেরাতে হয়েছিল! পঞ্চকোট রাজপরিবারের অজানা ইতিহাস

তিনি গোপনে কাশিপুরে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং ছেলেকে নিয়ে সেখানে চলে যান। রাজপরিবারের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।

পুরুলিয়ার প্রাচীন পঞ্চকোট রাজপরিবারের ইতিহাসে লুকিয়ে রয়েছে এমন বহু ঘটনা, যা আজও বিস্ময় জাগায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে রাজপরিবারের টানাপড়েন, রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাজাকে হত্যার চেষ্টা এবং রাজপ্রাসাদের অমূল্য সম্পদ—সব মিলিয়ে পঞ্চকোট সাম্রাজ্যের অতীত যেন এক জীবন্ত ইতিহাসের দলিল।

এই অজানা ও অকথিত ইতিহাস এবার জায়গা করে নিয়েছে লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে। পঞ্চকোট রাজপরিবারেরই সদস্য সূর্য নারায়ণ সিং দেও দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে তথ্য সংগ্রহ করে এই ইতিহাসকে একটি কফি টেবিল বইয়ের আকার দিয়েছেন।

বইটির নাম ‘Footprints of Panchakot Parmar Dynasty of Bengal’। ১৩টি অধ্যায়ে বিভক্ত ১০৩ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে উঠে এসেছে পঞ্চকোট সাম্রাজ্যের বহু অজানা কাহিনি।

পঞ্চকোটের ইতিহাসের অন্যতম চমকপ্রদ অধ্যায় শুরু হচ্ছে ১৭৯৮ সালের জুলাই মাসে।

তখন পঞ্চকোটের রাজা ছিলেন ভরতশেখর সিং দেও। সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজপরিবারের অধীনে থাকা ৮৬টি মৌজা নিলামে বিক্রি করে দেয়

কিন্তু কোম্পানির পরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান স্থানীয় প্রজারা। তাঁরা নতুন মালিককে খাজনা দিতে অস্বীকার করেন।

শুধু অনুরোধ বা প্রশাসনিক চাপ নয়, বলপ্রয়োগ করেও প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা সম্ভব হয়নি বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেই নিলামের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হয়। সম্পত্তি ফেরত দিতে হয় পঞ্চকোটের রাজার হাতে।

ব্রিটিশ শাসনামলের ইতিহাসে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলেই দাবি করা হয়েছে।

পঞ্চকোট রাজপরিবারের ইতিহাসে শুধু ব্রিটিশদের সঙ্গে সংঘাতই নয়, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ঘটনাও রয়েছে।

রাজা নীলমণি সিং দেও যখন মাত্র ৯ বছরের শিশু, তখন তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে।

প্রাসাদের বাগানবাড়িতে খেলছিলেন বালক নীলমণি। সেই সময় তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। তবে সৌভাগ্যক্রমে সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

এর পর নীলমণির মা, ওড়িশার কেওনঝড়ের রাজকন্যা বিদূষী মহিলা, ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

তিনি গোপনে কাশিপুরে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং ছেলেকে নিয়ে সেখানে চলে যান। রাজপরিবারের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।

পঞ্চকোট রাজপ্রাসাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিপুল সম্পদের গল্পও।

রাজপ্রাসাদের ‘জ্যোতি বিলাস’ অংশে হীরা, পান্না, রুবি, নীলা, পোখরাজ এবং সোনার মতো মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষিত ছিল বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে শুধু রত্ন বা সোনাই নয়, রাজাদের শিকারের স্মৃতিও সেখানে সংরক্ষিত ছিল।

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, লেপার্ড, হাতির পা, বাইসনের মুখ, বারোশিঙা-সহ বিভিন্ন প্রাণীর দেহাবশেষ ও শিকারের স্মারকও রাজপ্রাসাদের সংগ্রহের অংশ ছিল বলে জানা যায়।

এই সমস্ত নিদর্শন পঞ্চকোট রাজপরিবারের জীবনযাপন এবং সেই সময়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের একটি আলাদা ছবি তুলে ধরে।

পঞ্চকোট সাম্রাজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসকে লেখক বইটিতে ১৩টি অধ্যায় এবং ১০৩টি পৃষ্ঠায় সাজিয়েছেন।

এটি শুধুমাত্র রাজপরিবারের বংশপরিচয় বা রাজাদের তালিকা নয়। বরং সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক, রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ঘটনা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যকে একসঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

ফলে বইটিকে পঞ্চকোট রাজপরিবারের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এই বই তৈরির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণা।

রাজপরিবারের সদস্য এবং লেখক সূর্য নারায়ণ সিং দেও প্রায় ২০ বছর ধরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এরপর প্রায় ছয় বছর ধরে সেই তথ্যকে বইয়ের আকার দেওয়ার কাজ করেছেন।

তিনি কেন্দ্রীয় রেশম বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র বিজ্ঞানী। পেশাগত জীবনের বাইরে নিজের পরিবারের ইতিহাস সংরক্ষণে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন তিনি।

পঞ্চকোটের ইতিহাস নিয়ে এর আগে রাজপুরোহিত রাখাল চক্রবর্তী এবং লোকসংস্কৃতি গবেষক দিলীপ গোস্বামী কাজ করেছেন বলেও উল্লেখ করেছেন লেখক।

তবে তাঁর দাবি, পঞ্চকোট সাম্রাজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসের বহু অজানা অধ্যায় এখনও সাধারণ মানুষের কাছে সেভাবে পৌঁছয়নি।

সূর্য নারায়ণ সিং দেওয়ের মতে, পঞ্চকোট রাজপরিবারের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের ভুল তথ্য বা অপপ্রচার হয়েছে।

এমনকি একটি সিনেমায় পঞ্চকোটের রাজাদের নরবলি দেওয়ার মতো বিষয় দেখানো হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেছেন।

এই ধরনের উপস্থাপনার বিপরীতে তথ্যনির্ভর ইতিহাস তুলে ধরতেই তিনি বই লেখার সিদ্ধান্ত নেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পঞ্চকোট রাজপরিবার ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল। বইয়ের বিভিন্ন অংশে সেই ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে।

পঞ্চকোটের ইতিহাস নিয়ে তৈরি এই বইয়ের লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে জায়গা পাওয়া নিজেই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ই-মেলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। বই সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানোর পর তাঁদের নির্দেশ অনুযায়ী একটি সারসংক্ষেপও জমা দেওয়া হয়।

এরপর নির্দিষ্ট কমিটি বইটির বিষয়বস্তু এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে।

প্রায় দেড় মাসের প্রক্রিয়া শেষে বইটি ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংগ্রহে জায়গা পায়।

একটি রাজপরিবারের নিজস্ব ইতিহাসকে বইয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা শুধু পারিবারিক স্মৃতি ধরে রাখার বিষয় নয়। এর সঙ্গে একটি অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসও জড়িয়ে থাকে।

পঞ্চকোটের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পুরুলিয়া এবং বৃহত্তর বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে এই রাজবংশের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়কার ঘটনা থেকে শুরু করে রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, রাজপ্রাসাদের জীবনযাত্রা এবং ঐতিহ্য—সবকিছু একসঙ্গে তুলে ধরার ফলে বইটি ভবিষ্যৎ গবেষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।

লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংগ্রহে বইটির অন্তর্ভুক্তি তাই পঞ্চকোট রাজপরিবারের কাছে যেমন গর্বের, তেমনই বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তা তাৎপর্যপূর্ণ।

আর্কাইভ