খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বিদ্যুত চুক্তি বাতিল হচ্ছেনা,দাম কমাতে চলছে আলোচনা: জ্বালানিমন্ত্রী

বিগত সরকারের সময় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি এখনই বাতিল করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সরকার। কারণ এসব চুক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে...
Homeঅর্থ-বানিজ্যগ্যাস সংকটে কমছে পোশাক শিল্পের রফতানি আদেশ

গ্যাস সংকটে কমছে পোশাক শিল্পের রফতানি আদেশ

শুধু পোশাক শিল্প নয়, বস্ত্র, সিরামিক, স্টিল, কাগজসহ প্রায় সব উৎপাদনমুখী শিল্পই গ্যাস সংকটের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত দুই বছরে প্রায় ১৫০টি বস্ত্রকল বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমানে যেসব মিল চালু রয়েছে, তার অধিকাংশই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প আবারও কঠিন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি এখন শুধু উৎপাদন কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে না, এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও। সময়মতো উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমছে, নতুন রফতানি আদেশ হ্রাস পাচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে চাপে পড়ছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে আগামী কয়েক মাসে দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত আরও বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ক্রেতারা এমন দেশকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, যেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।

গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের পোশাক কারখানাগুলো স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে পারছে না। ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের বহু কারখানায় দিনে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। কোথাও আবার সম্পূর্ণ শিফট বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, প্রায় এক হাজারের মতো কারখানা গ্যাস সংকটের কারণে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। অতীতে রাতের দিকে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও এখন সেরকম কোন সুযোগও নেই। যার কারনে সারা দিন-রাত মিলিয়ে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলে সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে শুধু বর্তমান চালানই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ভবিষ্যতের অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

গাজীপুরের অনেক পোশাক কারখানা গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

কিছু প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়ে আকাশপথে রফতানি করছে। কিন্তু সমুদ্রপথের তুলনায় বিমানপথে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন :  ৮০ কিমি গতির ঝড়, হোটেলবন্দি থ্রি লায়ন্স! ভয়ংকর পরিস্থিতি কনসাস সিটিতে

কারখানার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পোশাক উৎপাদন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। স্পিনিং, ডাইং, ফিনিশিং কিংবা সেলাই যে কোনো একটি ধাপ বন্ধ হয়ে গেলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে সময়মতো শিপমেন্ট নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সময়মতো মানসম্মত পোশাক সরবরাহের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট সেই অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

একাধিক রফতানিকারক জানিয়েছেন, অনেক বিদেশি ব্র্যান্ড ইতোমধ্যেই নতুন অর্ডারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ অতিরিক্ত সময় দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প উৎস হিসেবে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া কিংবা অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের দিকে ঝুঁকছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, একবার কোনো আন্তর্জাতিক ক্রেতা অন্য দেশে উৎপাদন সরিয়ে নিলে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সাময়িক সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি)। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে নতুন রফতানি আদেশ প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হয়তো সংখ্যার দিক থেকে খুব বড় পতন নয়, কিন্তু এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নতুন অর্ডার কমে গেলে কয়েক মাস পর তার প্রভাব সরাসরি রফতানি আয়ে দেখা দেবে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বছরের শেষ ভাগে রফতানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে নিট পোশাক শিল্পে। কারণ এ খাতের অধিকাংশ কাঁচামাল স্থানীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিল থেকে সরবরাহ করা হয়।

গ্যাসের অভাবে স্পিনিং, ডাইং ও ফিনিশিং মিলগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে পোশাক কারখানাগুলো সময়মতো প্রয়োজনীয় কাপড় পাচ্ছে না।

এর ফলে অনেক উদ্যোক্তাকে বিদেশ থেকে কাপড় আমদানি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি লিড টাইমও দীর্ঘ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে দ্রুত সরবরাহ বড় একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা, সেখানে এই বিলম্ব বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন :  মেসিদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড়? ArgentinaOut ভোট নিয়ে বড় বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের মতে, গ্যাস সংকট এখন শিল্পখাতের জন্য জাতীয় পর্যায়ের একটি সংকটে পরিণত হয়েছে।

তিনি জানান, শুধু পোশাক শিল্প নয়, বস্ত্র, সিরামিক, স্টিল, কাগজসহ প্রায় সব উৎপাদনমুখী শিল্পই গ্যাস সংকটের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গত দুই বছরে প্রায় ১৫০টি বস্ত্রকল বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমানে যেসব মিল চালু রয়েছে, তার অধিকাংশই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

স্থানীয় সুতা ও কাপড় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদেশ থেকে বেশি কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। এতে দেশের মূল্য সংযোজন কমছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে বাংলাদেশ প্রায় ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। গত এক বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ মাসিক রফতানি।

তবে একই সঙ্গে দেখা গেছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মোট রফতানি প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, জুলাই মাসে সাধারণত শীতকালীন পোশাকের চালান বেশি থাকে। তাই এই সময় রফতানি কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এটিকে ভবিষ্যতের ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে নতুন অর্ডার কমছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

গ্যাস সংকটের কারণে পোশাক শিল্পের উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

অনেক কারখানাকে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। আবার সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিমানপথে রফতানি করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি উৎপাদন বিলম্ব, শ্রমিকদের অলস সময়ের মজুরি এবং বিকল্প ব্যবস্থাপনার খরচ মিলিয়ে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনেও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ উৎপাদন কমিয়েছে, আবার কেউ সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন :  মেসির শেষ বিশ্বকাপের লড়াই: আর্জেন্টিনার আশার প্রতীক কি এখনও ‘মেসি ও আরও ১০ জন’?

দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

গ্যাস সংকটের পাশাপাশি অর্ডার কমে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের চাপ, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং শ্রমিক অসন্তোষ সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিবেশ ক্রমেই জটিল হচ্ছে।

শিল্প-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে কয়েকশ’ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও চালু থাকলেও অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্যাস সংকট এখন আর শুধুমাত্র জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়। এটি রফতানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

পোশাক শিল্প বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে সরকারের রাজস্ব আয়, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

গ্যাস সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং কয়েকটি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক জটিলতা বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যাহত হলে বিদেশি ক্রেতারা সহজেই বিকল্প সরবরাহকারীর কাছে চলে যেতে পারেন।

শিল্প মালিকরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, শিল্পাঞ্চলে জ্বালানির অগ্রাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

তাদের মতে, বর্তমান সংকট দ্রুত সমাধান করা গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ধীরে ধীরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।

আর্কাইভ