ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারী শহিদদের পরিবার এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব। তিনি বলেন, একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয়, যখন যারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন কিংবা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের পাশে রাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়।
বুধবার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জুলাই যোদ্ধা, শহিদ পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা দেশের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতে হবে। তিনি বলেন, একটি পরিবার যখন তার প্রিয়জনকে হারায়, তখন শুধু একজন মানুষ নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তাবোধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এসব পরিবারের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, শুধু শহিদ পরিবার নয়, আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। যেসব তরুণ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, অঙ্গ হারিয়েছেন কিংবা স্থায়ীভাবে শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাদের জীবনের নতুন পথ তৈরি করা সরকারের দায়িত্বের অংশ।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো জুলাই আন্দোলনে শহিদদের পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা। একই সাথে আন্দোলনে আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
তার ভাষায়, একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ভর করে সে কীভাবে তার আত্মত্যাগী নাগরিকদের মূল্যায়ন করে। তাই জুলাই যোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলার সুযোগ নেই।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল ও স্মরণীয় অধ্যায়। তিনি উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। এর মধ্য দিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নতুন করে জাগ্রত হয় এবং দেশ নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান, নাফিজ, সজল, রাব্বি, মেরাজ, এলেম, তাইম, নাইমা, শিশু রিয়া গোপ, আহাদসহ সব শহিদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বলেন, দেশের জন্য তাদের আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সাহস ও গণতন্ত্রের চেতনায় অনুপ্রাণিত করবে। জাতি তাদের এই অবদান কখনও ভুলবে না।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন দৃষ্টিশক্তি হারানো জুলাই যোদ্ধাকে দেখে আবেগাপ্লুত হওয়ার কথা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, একজন মা তার অন্ধ সন্তানকে নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন এই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
তিনি বলেন, যে তরুণ গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য নিজের চোখ হারিয়েছে, তাকে যদি প্রাপ্য সম্মান পেতে বিভিন্ন দপ্তর বা মন্ত্রীর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে সেটি জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক হবে।
তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই যোদ্ধাদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে এবং রাষ্ট্র তাদের কল্যাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, নির্বাচিত সরকারও ভুল করতে পারে। তবে জনগণ গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সেই ভুল শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই সরকার ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বক্তব্যে অতীত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে নানা ধরনের অন্যায়, অবিচার, হত্যা, গুম, নির্যাতন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠলেও সে বিষয়ে কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি বলেন, একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তির উচিত নিজের ভুল স্বীকার করা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় সেই সংস্কৃতি দেখা যায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিজের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২৭ বছর বয়সে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যেতে চান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের প্রতি তার দায়বদ্ধতা এখনও শেষ হয়নি। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, পৃথিবীতে এমন নাগরিক খুব কমই পাওয়া যায়, যারা বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে নিজের আদর্শের পক্ষে অবিচল থাকতে পারেন।
তিনি বলেন, আবু সাঈদের মতো সাহসী তরুণদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মানুষের আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামী চেতনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাদের নিয়ে পুরো জাতি গর্ব অনুভব করে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগও সৃষ্টি করেছে।
তার মতে, এখন দেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের সামনে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। এই পথ সহজ নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ধরনের বিভাজন, বিদ্বেষ কিংবা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ যেন দেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে ঐক্য, দেশপ্রেম, সততা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, শহিদদের রক্তের বিনিময়ে যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ যেমন গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘটিত হয়েছিল, তেমনি জুলাইয়ের আন্দোলনের মূল লক্ষ্যও ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার।
তিনি দেশের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিটি নাগরিককে সচেতন থাকার আহ্বান জানান এবং বলেন, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেন। পরে শহিদ পরিবারের প্রতিনিধি এবং আহত জুলাই যোদ্ধারা তাদের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। অনুষ্ঠানের সূচনায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ, জুলাই শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
তথ্য সূত্র: বাসস

