খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফুটবলইংল্যান্ড জয়ের দিনই জাতীয় ফুটবল দল দিবস, কেন ১৫ জুলাই বেছে নিল...

ইংল্যান্ড জয়ের দিনই জাতীয় ফুটবল দল দিবস, কেন ১৫ জুলাই বেছে নিল আর্জেন্টিনা?

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, প্রতি বছর ১৫ জুলাই জাতীয় ফুটবল দল দিবস পালন করা হবে। তাদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাওয়া ঐতিহাসিক জয় দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপ জয়ের মুহূর্তের অভাব নেই। তবু দেশটির ফুটবল কর্তৃপক্ষ এমন একটি দিনকে জাতীয় মর্যাদা দিয়েছে, যা শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ, জাতীয়তাবোধ এবং রাজনৈতিক স্মৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিন নয়, বরং ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার দিন—১৫ জুলাই—এখন থেকে প্রতি বছর ‘জাতীয় ফুটবল দল দিবস’ হিসেবে পালন করবে আর্জেন্টিনা।

এই সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই জয় কেবল মাঠের লড়াই ছিল না, বরং বহু দশকের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, প্রতি বছর ১৫ জুলাই জাতীয় ফুটবল দল দিবস পালন করা হবে। তাদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাওয়া ঐতিহাসিক জয় দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

সেই ম্যাচে শুরুতেই পিছিয়ে পড়েছিল লিওনেল স্কালোনির দল। তবে দুর্দান্ত লড়াই করে ম্যাচে ফেরে আর্জেন্টিনা। এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্টিনেজের দুটি গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। নাটকীয় এই প্রত্যাবর্তন শুধু দলকে ফাইনালে তুলেই দেয়নি, গোটা দেশকে উৎসবের আবহে ভাসিয়ে দিয়েছিল।

বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের দিনকে বাদ দিয়ে সেমিফাইনালের জয়কে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। তবে এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের দাপট, চাপে আর্জেন্টিনা: বিরতিতে জমজমাট শো আর স্কালোনির কৌশল বদল

এএফএ জানিয়েছে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই জয় আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্য নয়, বরং জাতীয় আত্মমর্যাদা ও ঐক্যের প্রতীক। ম্যাচ শেষে ফুটবলারদের হাতে ধরা একটি ব্যানারও সেই বার্তাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। সেখানে লেখা ছিল—

“ফকল্যান্ড আমাদের।”

এই একটি বাক্যই ফুটবল ম্যাচটিকে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

ফকল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের বিরোধ প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ বর্তমানে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে এটিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে।

১৮৩৩ সালে ব্রিটেন দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকে বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়ে পরিণত হয়।

দুই দেশের বিরোধ ১৯৮২ সালে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। তৎকালীন আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট লিওপোল্ড গালতিয়েরির নির্দেশে সেনাবাহিনী ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে অভিযান চালায়।

এর জবাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার বিশাল নৌবহর, যুদ্ধবিমান ও সেনা পাঠান দক্ষিণ আটলান্টিকে। টানা ৭৪ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা পরাজিত হয় এবং দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেনের কাছেই থেকে যায়।

এই সংঘর্ষে প্রায় ৬৫০ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। যুদ্ধ শেষ হলেও বিরোধের অবসান হয়নি। আজও আর্জেন্টিনা দ্বীপগুলোর ওপর নিজেদের দাবি বজায় রেখেছে।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে আবারও মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত লড়াই।

আরও পড়ুন :  ঋণ বিতরণ কমলেও বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে

দিয়েগো মারাদোনা প্রথমে বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল করেন। এরপর ছয়জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেন অবিশ্বাস্য এক গোল, যা এখনও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে পরিচিত।

সেই ম্যাচকে অনেকেই ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখেছিলেন। ফলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রতিটি ম্যাচই আর্জেন্টিনার কাছে শুধুমাত্র ফুটবল নয়, বরং জাতীয় আবেগের অংশ হয়ে ওঠে।

চার দশকেরও বেশি সময় পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস লেখে আর্জেন্টিনা। এবারও জয় আসে নাটকীয়ভাবে পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে ফিরে।

এই জয়কে অনেকেই মারাদোনার সময়ের ঐতিহাসিক অধ্যায়ের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখছেন। পার্থক্য শুধু একটাই—এবার নেতৃত্বে ছিলেন লিওনেল মেসি প্রজন্মের আর্জেন্টিনা।

দলের দৃঢ় মানসিকতা, আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। ফলে ১৫ জুলাইয়ের জয় দ্রুতই জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনার বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার সমর্থক রাস্তায় নেমে উৎসব করেন। রাজধানী বুয়েনস আইরেসসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতভর চলে উদযাপন।

জাতীয় পতাকা, গান, আতশবাজি এবং ফুটবলপ্রেমীদের উল্লাসে পুরো দেশ যেন এক বিশাল উৎসবের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। সেই আবেগই এখন প্রতি বছর সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে নতুন করে উদযাপিত হবে।

আর্জেন্টিনায় ফুটবল বরাবরই জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বকাপ জয়, মারাদোনা, মেসি কিংবা ঐতিহাসিক ম্যাচ—সবকিছুই দেশটির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে মিশে গেছে।

আরও পড়ুন :  পোশাক শিল্পের বিকাশে বাধা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

১৫ জুলাইকে জাতীয় ফুটবল দল দিবস হিসেবে ঘোষণা সেই ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করল। এটি শুধু একটি জয়কে স্মরণ করার উদ্যোগ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের ফুটবল ঐতিহ্য, সংগ্রাম এবং ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও একটি প্রয়াস।

এএফএ জানিয়েছে, প্রতি বছর ১৫ জুলাই বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় ফুটবল দল দিবস উদযাপন করা হবে। দেশজুড়ে বিভিন্ন ফুটবল একাডেমি, ক্লাব এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্মারক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী, তরুণ ফুটবলারদের জন্য বিশেষ আয়োজন এবং জাতীয় দলের ঐতিহাসিক মুহূর্ত তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বাস, এই দিনটি সময়ের সঙ্গে আরও বড় জাতীয় উৎসবে পরিণত হবে এবং নতুন প্রজন্মকে আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করবে।

বিশ্বকাপ জয় নিঃসন্দেহে যেকোনো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ক্রীড়া অর্জন। তবুও আর্জেন্টিনা দেখিয়ে দিল, কিছু ম্যাচের মূল্য ট্রফির চেয়েও বেশি হতে পারে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের জয় তাদের কাছে শুধু ফাইনালে ওঠার গল্প নয়, বরং ইতিহাস, জাতীয় আত্মপরিচয় এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আবেগের প্রতিফলন।

এই কারণেই ১৫ জুলাই এখন থেকে শুধু একটি তারিখ নয়; এটি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে গর্ব, সংগ্রাম এবং ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকবে।

আর্কাইভ