খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeমেডিকেল জার্নালদাঁতের ক্ষয় রুখতে যুগান্তকারী আবিষ্কার! লালার সাহায্যে নতুন দাঁত গজানোর জেল তৈরি...

দাঁতের ক্ষয় রুখতে যুগান্তকারী আবিষ্কার! লালার সাহায্যে নতুন দাঁত গজানোর জেল তৈরি বিজ্ঞানীদের

গবেষকেরা এমন একটি বিশেষ প্রোটিন ব্যবহার করেছেন, যা দাঁতের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে পৌঁছে লালার ভেতরে থাকা প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করে। এরপর ধীরে ধীরে সেই খনিজ দিয়ে নতুন এনামেলের স্তর তৈরি হতে শুরু করে।

দাঁতের ক্ষয়, ক্যাভিটি কিংবা এনামেল নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যায় কমবেশি সবাই কখনও না কখনও ভুগেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। একসময় ক্ষয় এতটাই বেড়ে যায় যে দাঁত তুলে ফেলা বা কৃত্রিম দাঁত বসানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তবে ভবিষ্যতে সেই চিত্র বদলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা এমন একটি বিশেষ জেল তৈরি করেছেন, যা ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের বাইরের আবরণ বা এনামেল পুনর্গঠনে সাহায্য করতে পারে। শুধু তাই নয়, গবেষকদের দাবি—এই প্রযুক্তি একদিন প্রাকৃতিকভাবে নতুন দাঁত গজানোর পথও খুলে দিতে পারে।

এই নতুন আবিষ্কার এখনও গবেষণার পর্যায়ে থাকলেও দন্তচিকিৎসা বিজ্ঞানে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ভবিষ্যতে দাঁতের চিকিৎসার ধরণই বদলে যেতে পারে।

দাঁতের সবচেয়ে বাইরের শক্ত সাদা স্তরকে বলা হয় এনামেল। এটি মানবদেহের সবচেয়ে শক্ত টিস্যুগুলোর একটি। কিন্তু একবার এই স্তর ক্ষয় হতে শুরু করলে শরীর স্বাভাবিকভাবে সেটি আর তৈরি করতে পারে না।

এনামেল ক্ষয়ে গেলে দাঁতে শিরশির অনুভূতি, ঠান্ডা-গরমে ব্যথা, ক্যাভিটি, সংক্রমণ এবং ধীরে ধীরে দাঁত দুর্বল হয়ে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে দাঁত ভেঙে যাওয়া বা তুলে ফেলার প্রয়োজনও হতে পারে।

বর্তমানে দাঁতের ক্ষয় পূরণে ফিলিং, ক্রাউন, রুট ক্যানাল বা কৃত্রিম দাঁতের মতো চিকিৎসা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বিকল্প তৈরি করে, নতুন করে প্রাকৃতিক এনামেল গঠন করতে পারে না।

আরও পড়ুন :  দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য: কীভাবে ডিম্বাণুর গুণমান ও প্রজনন ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে

ব্রিটেনের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব ফার্মেসি’ এবং ‘ডিপার্টমেন্ট অব কেমিক্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর গবেষকেরা ফ্লোরাইডমুক্ত একটি বিশেষ জেল তৈরি করেছেন।

গবেষকদের লক্ষ্য এমন একটি উপাদান তৈরি করা, যা ক্ষতিগ্রস্ত দাঁতের উপরিভাগে প্রাকৃতিকভাবে নতুন মিনারেল জমা করে এনামেল পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। এই জেল মুখের ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে দাঁতের ক্ষয় পূরণের চেষ্টা করে, যা প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা।

এই জেলের সবচেয়ে অভিনব দিক হলো, এটি মুখের লালায় থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফেটকে কাজে লাগায়।

গবেষকেরা এমন একটি বিশেষ প্রোটিন ব্যবহার করেছেন, যা দাঁতের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে পৌঁছে লালার ভেতরে থাকা প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করে। এরপর ধীরে ধীরে সেই খনিজ দিয়ে নতুন এনামেলের স্তর তৈরি হতে শুরু করে।

এই পুরো প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানীরা এপিট্যাক্সিয়াল মিনারেলাইজেশন (Epitaxial Mineralization) নামে অভিহিত করেছেন।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন যে এনামেল তৈরি হবে, তা কৃত্রিমভাবে বসানো কোনো আবরণ নয়; বরং দাঁতের বিদ্যমান গঠনের সঙ্গেই প্রাকৃতিকভাবে যুক্ত হয়ে যাবে।

গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল নিয়ে আশাবাদী হলেও বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিতভাবে বলেননি যে এই জেল ব্যবহার করলেই মানুষের নতুন দাঁত গজাবে।

আরও পড়ুন :  বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ঘরোয়া শরবত: গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা প্রাচীন শীতল পানীয়ের সহজ রেসিপি

তাঁদের ধারণা, যদি এনামেল পুনর্গঠনের প্রযুক্তি সফলভাবে আরও উন্নত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দাঁতের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ, বিষয়টি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। তাই এটিকে নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবেই দেখা উচিত।

বিভিন্ন কারণে দাঁতের এনামেল ধীরে ধীরে নষ্ট হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া
  • কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত অ্যাসিডযুক্ত খাবার গ্রহণ
  • অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা
  • দাঁত নিয়মিত পরিষ্কার না করা
  • ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার
  • বয়সজনিত পরিবর্তন
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা পর্যাপ্ত লালা না থাকা

এসব কারণে দাঁতের উপরিভাগের সুরক্ষাবর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্যাভিটি দ্রুত তৈরি হয়।

বর্তমানে দাঁতের ক্ষয় হলে চিকিৎসকেরা সাধারণত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিষ্কার করে ফিলিং করেন অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রাউন বা রুট ক্যানালের পরামর্শ দেন।

নতুন জেলের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এটি ক্ষয় হওয়া অংশে নতুন করে খনিজ জমা করে দাঁতের প্রাকৃতিক কাঠামো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। ফলে ভবিষ্যতে দাঁত সংরক্ষণের আরও কার্যকর উপায় পাওয়া যেতে পারে।

যদিও এই প্রযুক্তি এখনও পরীক্ষাধীন, তবুও এটি দন্তচিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, জেলটির ওপর এখনও বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চলছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা আশাব্যঞ্জক মনে হলেও আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেওয়া হবে না।

আরও পড়ুন :  ৩৯ বছরেও বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক: লিওনেল মেসির ফিটনেস, ডায়েট ও সাফল্যের গোপন রহস্য

সব ধরনের পরীক্ষা সফল হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নতুন প্রযুক্তি বাজারে আসতে সময় লাগলেও এখন থেকেই দাঁতের যত্ন নেওয়া জরুরি।

  • দিনে অন্তত দুইবার ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করুন।
  • অতিরিক্ত মিষ্টি ও কোমল পানীয় কম খান।
  • ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য এড়িয়ে চলুন।
  • নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ করান।
  • খাবারের পর পরিষ্কার পানি দিয়ে কুলি করুন।
  • দাঁতে ব্যথা, শিরশিরানি বা ক্যাভিটি হলে দেরি না করে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দাঁতের এনামেল একবার ক্ষয় হলে তা আর স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসে না—এটাই এতদিনের ধারণা ছিল। কিন্তু নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। মুখের লালাকে কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিকভাবে এনামেল পুনর্গঠনের এই প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে দাঁতের চিকিৎসা আরও সহজ, কার্যকর এবং কম ব্যয়বহুল হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই জেল এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এটি বাজারে আসার আগে বা চিকিৎসায় ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়ার আগ পর্যন্ত নিয়মিত দাঁতের পরিচর্যা এবং চিকিৎসকের পরামর্শই সুস্থ দাঁত ও মাড়ি রক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।