খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশেষ প্রতিবেদনমেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন যেসব রাষ্ট্রপতি, বিশ্বরাজনীতির আলোচিত ৫ ঘটনা

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন যেসব রাষ্ট্রপতি, বিশ্বরাজনীতির আলোচিত ৫ ঘটনা

যেখানে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কার্যকর থাকে, সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের পদত্যাগ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয় না। বরং আইন অনুযায়ী দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পথ সুগম হয়।

রাষ্ট্রপতির পদ সাধারণত একটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বগুলোর একটি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপ্রধান নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করার পর দায়িত্ব ছাড়েন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির অভিযোগ, গণআন্দোলন, সাংবিধানিক সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় কিংবা অভিশংসনের মতো পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে হয়েছে। এসব ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশেও রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছাড়ার উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। ইতিহাস বলছে, একেক দেশে একেক ধরনের পরিস্থিতি রাষ্ট্রপ্রধানদের পদত্যাগে বাধ্য করেছে।

কেন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন রাষ্ট্রপতিরা?

রাষ্ট্রপতির আগাম পদত্যাগের পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ থাকে। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ রাষ্ট্রপ্রধানকে চাপে ফেলে, কোথাও দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। আবার অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট বা জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে ক্ষমতায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে সংসদের অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতিরা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। আবার কোথাও আদালতের রায় কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তের কারণে তাদের দায়িত্ব ছাড়তে হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া: দুর্নীতির অভিযোগে দায়িত্ব হারান পার্ক গিউন-হে

দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হে বিশ্বের আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

আরও পড়ুন :  ঘানার ওঝার বিস্ফোরক ভবিষ্যদ্বাণী! রোনাল্ডোর হাতেই উঠবে বিশ্বকাপ ট্রফি?

অভিযোগের পর দেশজুড়ে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। সংসদে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং পরে দক্ষিণ কোরিয়ার সাংবিধানিক আদালত সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

ফলে তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদ হারান। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিচারও অনুষ্ঠিত হয় এবং দীর্ঘ সময় কারাভোগ করতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

পেরু: রাজনৈতিক অস্থিরতার স্থায়ী উদাহরণ

লাতিন আমেরিকার দেশ পেরু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য পরিচিত। গত এক দশকে দেশটিতে একাধিক প্রেসিডেন্ট পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

২০১৮ সালে দুর্নীতির অভিযোগ এবং অভিশংসনের মুখে প্রেসিডেন্ট পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কি পদত্যাগ করেন।

এরপর ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকারাকে কংগ্রেস অপসারণ করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়।

একই বছরে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ম্যানুয়েল মেরিনোও জনরোষের মুখে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এসব ঘটনায় পেরুর রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শ্রীলঙ্কা: অর্থনৈতিক সংকট থেকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রবেশ করেন। গণআন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান।

পরবর্তীতে বিদেশে অবস্থান করেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র পাঠান। সাম্প্রতিক বিশ্বরাজনীতিতে এটি সবচেয়ে আলোচিত রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও পড়ুন :  বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

জার্মানি: নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ

জার্মানির সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান উলফের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে।

যদিও অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবে তদন্ত শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

রাষ্ট্রপতির মর্যাদা এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনা করে ২০১২ সালে তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ছিল নৈতিক দায় স্বীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

বলিভিয়া: নির্বাচনী সংকটের পর ক্ষমতা ছাড়েন ইভো মোরালেস

২০১৯ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বলিভিয়ায় বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়।

বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন এবং সেনাবাহিনীর অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

পরে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে আশ্রয় নেন। তার পদত্যাগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতির আগাম বিদায়ের পেছনে কী বার্তা রয়েছে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপ্রধানদের আগাম বিদায়ের পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না।

কখনো দুর্নীতির অভিযোগ রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তোলে, কখনো অর্থনৈতিক সংকট জনগণের ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। আবার কোথাও আদালত, সংসদ কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পথ তৈরি করে।

এ ধরনের ঘটনা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং জবাবদিহির গুরুত্বও তুলে ধরে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ মূলত একটি সাংবিধানিক পদ। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

আরও পড়ুন :  ব্রাজিলে ১১ লাখ টাকায় ‘Body Count’ শূন্য! সত্যিই কি অতীত মুছে ফেলা সম্ভব?

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে।

এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি না হওয়া।

বিশ্বরাজনীতি থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রপতিদের আগাম পদত্যাগের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু ব্যক্তিনির্ভর নয়; বরং শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যেখানে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কার্যকর থাকে, সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের পদত্যাগ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয় না। বরং আইন অনুযায়ী দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পথ সুগম হয়।

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বিশ্বরাজনীতিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। দক্ষিণ কোরিয়া, পেরু, শ্রীলঙ্কা, জার্মানি ও বলিভিয়ার মতো দেশে ভিন্ন ভিন্ন কারণে রাষ্ট্রপ্রধানরা দায়িত্ব ছেড়েছেন। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ, কোথাও গণআন্দোলন, কোথাও অর্থনৈতিক বিপর্যয় কিংবা রাজনৈতিক সংকট তাদের পদত্যাগে ভূমিকা রেখেছে।

এসব উদাহরণ দেখায়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপ্রধানের পদে পরিবর্তন ঘটলেও যদি সংবিধান অনুযায়ী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।