বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েকদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তার পদত্যাগপত্র পৌঁছে দেওয়া হয়। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগ শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংবিধানিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। পদত্যাগপত্রে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার কারণ, নিজের স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং দায়িত্ব পালনকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি একাধিক জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। এসব রোগের কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতার পাশাপাশি সম্প্রতি তার শরীরে অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝে মাঝে সাময়িকভাবে অচেতন হয়ে পড়েন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
নিজের পদত্যাগপত্রে সাবেক রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, দায়িত্ব পালনকালে তিনি সর্বদা নিষ্ঠা, সততা এবং সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য বজায় রেখেছেন।
তিনি বলেন, শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা আর সম্ভব নয়। তাই সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি দেশের সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিজের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন।
পদত্যাগপত্রে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়ও উল্লেখ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
তিনি বলেন, সে সময় দেশে সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চেয়েছিলেন।
পরবর্তীতে আদালতের পরামর্শ অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথ সুগম করা হয়।
তার দাবি, এই সিদ্ধান্তগুলোর ফলে দেশে বড় ধরনের কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি পদত্যাগপত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পড়ে শোনান এবং জানান, সংবিধান অনুযায়ী তিনি স্পিকার হিসেবে শপথের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির শপথও গ্রহণ করেছেন।
ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনিই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ১ মিনিটে স্পিকার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চাইলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে দায়িত্ব ছাড়তে পারেন।
অন্যদিকে ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়া সংবিধান অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়। একজন মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি অসুস্থ হতে পারেন এবং স্বাস্থ্যগত কারণে দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াও অস্বাভাবিক নয়।


তার মতে, পদত্যাগের মাধ্যমে এতদিনের সব ধরনের জল্পনা-কল্পনার অবসান হয়েছে।
স্পিকার বলেন, মো. সাহাবুদ্দিন অতীতে ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি তিনি সবসময় সম্মান ও সহযোগিতার মনোভাব দেখিয়েছেন।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন বলেও মন্তব্য করেন স্পিকার।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছিল।
বিশেষ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার খবর প্রকাশের পর এই আলোচনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
কারণ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের দায়িত্ব স্পিকারের ওপরই বর্তায়।
যদিও দেশে ফেরার পর সকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্পিকার জানিয়েছিলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। পরে বিকেলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের মাধ্যমে সব জল্পনার অবসান ঘটে।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন।
তৎকালীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিল মাসে। কিন্তু প্রায় তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
কিছু রাজনৈতিক দল তার অপসারণের দাবি তুললেও অন্যরা সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে তাকে দায়িত্বে রাখার পক্ষে মত দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।
পদত্যাগের আগের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, সরকার রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বলেনি। তবে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চাইলে ব্যক্তিগত বা স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করার অধিকার রাখেন।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
তবে সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে। ততদিন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে দায়িত্ব ছাড়লেও পদত্যাগপত্রে তিনি নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। এখন দেশের দৃষ্টি নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে, যা আগামী ৯০ দিনের মধ্যেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন হওয়ার কথা।

