ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দাবানলের প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় স্পেন সরকার প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) নেওয়া এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দাবানল নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক স্থানে একসঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়া, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কারণেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে স্পেন।
দাবানলের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায়। আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করায় আশপাশের বিভিন্ন শহর ও জনবসতি থেকে ১০ হাজারেরও বেশি বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে মাদ্রিদের পার্শ্ববর্তী আভিলা প্রদেশে তিনটি বড় দাবানল একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে। এরপরই সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। এর ফলে স্থানীয় প্রশাসনের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার উদ্ধার, অগ্নিনির্বাপণ ও সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একাধিক কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে , একই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় দাবানলের বিস্তার, তীব্র গরম ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, পর্যাপ্ত জনবল, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও সরকারি সম্পদ দ্রুত মোতায়েনের প্রয়োজন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়বে এবং উদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
আভিলা প্রদেশের নাভালুয়েঙ্গা শহরে বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হেলিকপ্টারগুলোকে কাছাকাছি নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে বারবার আগুনের ওপর ফেলতে দেখা যায়।
ঘন ধোঁয়ায় পুরো এলাকা ঢেকে যায়। নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা মাস্ক পরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। আগুনের তীব্রতা ও ধোঁয়ার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিনের বাসিন্দারাও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা আগে কখনও দেখেননি বলে জানিয়েছেন। নাভালুয়েঙ্গার বাসিন্দা হাভিয়ের মার্তিন রয়টার্সকে বলেন, তিনি ৩৬ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন, কিন্তু এত বড় দাবানল আগে কখনও প্রত্যক্ষ করেননি।
তার ভাষায়, আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হলেও রাতের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। অল্প সময়ের ব্যবধানে আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।
দাবানল মোকাবিলায় স্পেন সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ২৭০ জনেরও বেশি জরুরি সেবাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি কাজ করছে ৪০টি স্থলভিত্তিক অগ্নিনির্বাপণ ইউনিট এবং সামরিক জরুরি ইউনিটের বিশেষ সদস্যরা।
এছাড়া হেলিকপ্টার ও অন্যান্য বিশেষায়িত সরঞ্জামের সাহায্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তবে প্রবল গরম, দমকা বাতাস এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোপীয় ফরেস্ট ফায়ার ইনফরমেশন সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত স্পেনে ৩৫০টিরও বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। এটি দেশটির বনাঞ্চল ও পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরও দাবানলের কারণে স্পেনে রেকর্ড পরিমাণ বনভূমি ও প্রাকৃতিক এলাকা পুড়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, খরা এবং শুষ্ক আবহাওয়া ভবিষ্যতে এমন ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে সতর্ক করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানলের সংখ্যা ও তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির অভাব, উচ্চ তাপমাত্রা এবং প্রবল বাতাস আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

