বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। পদত্যাগপত্রে তিনি নিজের শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব নয়।
এই পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদ্দেশে লেখা পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে একাধিক জটিল রোগে ভুগছেন। এসব শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনির জটিলতায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত। এর পাশাপাশি তাঁর হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারিও সম্পন্ন হয়েছে। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর শরীরে অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামের একটি জটিল রোগ শনাক্ত হয়েছে, যা তাঁর শারীরিক অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন, অটোনোমিক নিউরোপ্যাথির কারণে তিনি মাঝে মধ্যেই হঠাৎ অল্প সময়ের জন্য অচেতন হয়ে পড়েন। এই রোগ মানবদেহের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, যার ফলে রক্তচাপ, হৃদস্পন্দনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
তিনি জানান, বিভিন্ন রোগের সম্মিলিত প্রভাবে তাঁর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব নয় বলেই তিনি মনে করছেন।
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন আরও উল্লেখ করেন, তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থার কারণে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন রয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে বিশ্রামে থাকতে হবে এবং নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতার কারণে দায়িত্বে বহাল থাকা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। তাই দেশের সাংবিধানিক স্বার্থ বিবেচনায় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

নিজের পদত্যাগের আইনি ভিত্তিও পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করছেন।
এই সাংবিধানিক বিধান রাষ্ট্রপতিকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পদত্যাগ করার সুযোগ দেয়। সেই বিধান অনুসরণ করেই তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর দেশের সাংবিধানিক কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য সংবিধানে বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণ ও দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই রাষ্ট্রপ্রধানের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলেও সংবিধানের নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। সংবিধানে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে দায়িত্ব হস্তান্তর এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করাই রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সে কারণে দায়িত্ব পালনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাও সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির জটিলতা এবং অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিসহ একাধিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে অপারগ বলে জানিয়েছেন।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর পদত্যাগ কার্যকর হয়েছে এবং নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এভাবে সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

