বাংলাদেশের রফতানি খাতকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করতে রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানি আয় দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ রপ্তানিকারকরা ভবিষ্যতে আর ইডিএফ থেকে ঋণ সুবিধা পাবেন না। একইসঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানের ইডিএফ ঋণ পরবর্তীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাধারণ ঋণের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে, তারাও এই বিশেষ তহবিলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন নির্দেশনাগুলো একত্র করে একটি সমন্বিত মাস্টার সার্কুলার প্রকাশ করেছে। এতে ইডিএফ পরিচালনার নীতিমালা, সুদের হার, ঋণের মেয়াদ, পুনরর্থায়ন এবং অর্থায়নের সীমাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রফতানি আয় দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা। এখন থেকে যেসব রপ্তানিকারক নির্ধারিত সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনতে ব্যর্থ হবেন, তারা ইডিএফ সুবিধা গ্রহণের যোগ্য থাকবেন না।
এছাড়া, যেসব প্রতিষ্ঠানের ইডিএফ ঋণ পরিশোধে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এবং পরে সেই দায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাধারণ ঋণের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে, তারাও নতুন করে এই তহবিল থেকে অর্থায়ন পাবেন না।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত রফতানি আয় দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
নতুন মাস্টার সার্কুলারে ইডিএফ ঋণের সুদ নির্ধারণেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ছয় মাসের বেঞ্চমার্ক সুদের হারকে ভিত্তি ধরে ঋণের সুদ নির্ধারণ করা হবে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বেঞ্চমার্ক হারের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.৫০ শতাংশ সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক এই তহবিল সরবরাহ করবে। এদিকে রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে বেঞ্চমার্ক হারের সঙ্গে সর্বোচ্চ ১.৫০ শতাংশ অতিরিক্ত সুদ আদায় করতে পারবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো
এর ফলে সুদের হার নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও বাজারভিত্তিক কাঠামো তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইডিএফ ঋণ পরিশোধের সাধারণ সময়সীমা আগের মতোই ১৮০ দিন রাখা হয়েছে। তবে কোনো যৌক্তিক কারণ থাকলে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে এই মেয়াদ সর্বোচ্চ ২৭০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।
এতে প্রকৃত সমস্যায় পড়া রপ্তানিকারকরা প্রয়োজনীয় সময় পাওয়ার সুযোগ পাবেন, তবে তা হবে নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায়।
নতুন নীতিমালায় কঠোরতার পাশাপাশি পুনরায় যোগ্য হওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
যদি কোনো রপ্তানিকারক আটকে থাকা রফতানি আয় দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসকাউন্ট কমিটির কাছ থেকে বিশেষ অব্যাহতি পান, তাহলে তিনি আবারও ইডিএফ সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন।
অর্থাৎ, স্থায়ীভাবে সুবিধা বাতিল না করে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের মাধ্যমে পুনরায় অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র বা এলসির ক্ষেত্রে আগের অর্থায়ন সীমা বহাল রাখা হয়েছে।
খাতভেদে এই ব্যবস্থার আওতায় সর্বোচ্চ ২ কোটি মার্কিন ডলার বা ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়ন পাওয়া যাবে। ফলে তৈরি পোশাকসহ রফতানিমুখী বিভিন্ন শিল্পখাত আগের মতোই এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে।
বাল্ক আমদানির ক্ষেত্রেও অর্থায়নের সীমা বহাল রাখা হয়েছে।
এ অবস্থায় ১০ লাখ ডলার থেকে ২ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ থাকবে।
তবে নতুন সার্কুলারে একটি অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত হয়েছে। এখন থেকে খাত নির্বিশেষে যেকোনো যোগ্য বাল্ক আমদানির বিপরীতে সর্বোচ্চ ৫ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ইডিএফ পুনরর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করা যাবে।
এই সিদ্ধান্ত বিশেষ করে কাঁচামাল আমদানিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, যেসব ব্যবসায়ী একই সঙ্গে বাল্ক আমদানি এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি করেন, তারা দুটি উৎস থেকে একযোগে সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে পারবেন না।
তাদের কেবল একটি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের নির্ধারিত অর্থায়ন সীমার মধ্যেই সুবিধা গ্রহণ করতে হবে।
এই নিয়মের মাধ্যমে একই প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত অর্থায়ন গ্রহণের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে পৃথক পৃথক সার্কুলারের মাধ্যমে ইডিএফ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। ফলে অনেক ব্যাংক ও রপ্তানিকারক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির মুখে পড়তেন।
নতুন সার্কুলারে সকল নির্দেশনা একত্রে হওয়ায় বর্তমান নীতিমালা বোঝা এবং অনুসরণ করা পূর্বের থেকে সহজ হবে।
একইসঙ্গে ঋণ আবেদন, ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি, পুনরর্থায়ন এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও গতি বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই নীতিমালার ফলে রপ্তানিকারকদের মধ্যে সময়মতো রফতানি আয় দেশে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা বাড়বে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও আরও নিয়মতান্ত্রিক হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ শুধু ইডিএফ তহবিলের কার্যকারিতা বাড়াবে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
রপ্তানিকারকদের জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে, সময়মতো রফতানি আয় দেশে প্রত্যাবাসন করা এখন আর শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ভবিষ্যতে স্বল্পসুদে অর্থায়ন সুবিধা পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত। নতুন মাস্টার সার্কুলারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইডিএফ ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের রফতানি খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

