যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর নতুন অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হয়েছে। এর ফলে দেশের রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকার ইস্যুতেও নতুন বার্তা বহন করছে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, অনেক দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এসব দেশের রফতানিকারকরা অন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাচ্ছে।
আমেরিকার প্রশাসন বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে নতুন করে গঠনের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র অতক আগে থেকেই জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর আমদানি নীতি মেনে আসছিল। তারা এখন চায়, তাদের বাণিজ্য অংশীদাররাও একই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করুক।
নতুন ঘোষণার আওতায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। একই হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মেক্সিকো, কম্বোডিয়া, জর্ডান, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, এল সালভাদর, একুয়েডর এবং ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর মতো দেশগুলোর পণ্যের ওপরও।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন (এমএফএন)’ শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট শুল্কহার ১০ অথবা ১২.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে আরও ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর। চীনও রয়েছে এই তালিকায়। আমেরিকার অভিযোগ, চীনে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। তবে তাদের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে চীন অনেক আগে থেকে।
এই অতিরিক্ত শুল্ক ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় আরোপ করা হয়েছে। এই আইন যুক্তরাষ্ট্রকে এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দেয়, যাদের নীতি বা কার্যক্রমকে তারা অন্যায্য বলে মনে করে।
ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় ৯৯.৪ শতাংশ পণ্যের ওপর এই নতুন শুল্ক কার্যকর হবে।
তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্য এই সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য, জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট পণ্য,গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ)-এর শর্ত পূরণকারী পণ্যও নতুন শুল্কের আওতায় পড়বে না। উত্তর আমেরিকার সমন্বিত উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য কেবল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়। এর মাধ্যমে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন, জোরপূর্বক শ্রম এবং অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চায়।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক শতাব্দী ধরে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির বিরুদ্ধে কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে। এখন সময় এসেছে বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোকেও একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের।
বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। আর এই খাতের অন্যতম প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ফলে নতুন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা আরও কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়, মুনাফার হার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখাও আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।
নতুন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শ্রম অধিকার, কর্মপরিবেশ, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা এবং জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে আরও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
ফলে বাংলাদেশের রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমমান মেনে চলা, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জবাবদিহিতা বাড়ানো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে তার রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে দেশের প্রধান রফতানি খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

