খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভসোনার চেয়েও দামি ছিল যে বেগুনি রং, প্রাচীন রোমান সমাধিতে মিলল সেই...

সোনার চেয়েও দামি ছিল যে বেগুনি রং, প্রাচীন রোমান সমাধিতে মিলল সেই রহস্যময় পোশাকের সন্ধান

প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে যা আজও মানুষকে অবাক করে দেয়। কখনও মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা রাজপ্রাসাদ, কখনও হাজার বছরের পুরনো মুদ্রা, আবার কখনও এমন কোনও বস্তু যা সেই সময়ের সমাজব্যবস্থা ও মানুষের জীবনযাত্রার ছবি তুলে ধরে। এবার ইংল্যান্ডে আবিষ্কৃত এক প্রাচীন রোমান সমাধিক্ষেত্র ঘিরে তৈরি হয়েছে তেমনই চাঞ্চল্য। কারণ সেখানে এমন এক বিশেষ বেগুনি রংয়ের সন্ধান মিলেছে, যার দাম একসময় সোনার চেয়েও বেশি ছিল।

গবেষকেরা জানাচ্ছেন, এই আবিষ্কার শুধু প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং রোমান সাম্রাজ্যের ধনসম্পদ, অভিজাত সংস্কৃতি এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের এক বিরল প্রমাণও বটে।

রোমান যুগের সমাধিক্ষেত্রে মিলল বিস্ময়কর আবিষ্কার

ইংল্যান্ডে একটি সহস্রাব্দ প্রাচীন রোমান সমাধিক্ষেত্রে গবেষণার কাজ চলছিল। সেই সময় প্রত্নতত্ত্ববিদেরা দুটি বিশেষ সমাধির সন্ধান পান। একটি সমাধিতে প্রায় ২ বছর বয়সি এক শিশুর দেহাবশেষ পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয়, তার পাশেই শায়িত ছিল দুই পূর্ণবয়স্ক মানুষের দেহ। অন্য সমাধিটিতে ছিল কয়েক মাস বয়সি আরেক শিশুর দেহ।

প্রথমে এটি সাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে গবেষকেরা যখন মৃতদেহগুলির উপর থাকা কাপড় পরীক্ষা করেন, তখনই সামনে আসে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য।

সোনার জরিতে মোড়া ছিল দেহ

সমাধিতে পাওয়া কাপড়গুলি ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। শুধু দামি কাপড়ই নয়, তার উপর ছিল সূক্ষ্ম সোনার জরির কাজ। এতেই বোঝা যায়, ওই ব্যক্তিরা সাধারণ পরিবারের সদস্য ছিলেন না। সম্ভবত তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত ধনী বা সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

আরও পড়ুন :  রাফিনহার চোট কতটা গুরুতর? বিশ্বকাপে ব্রাজিল শিবিরে দুশ্চিন্তার ছায়া

তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে ছিল কাপড়ের রংয়ে। পরীক্ষার পর গবেষকেরা জানতে পারেন, ওই কাপড়ে ব্যবহার করা হয়েছিল বিখ্যাত টাইরিয়ান পার্পল রং। ইতিহাসে এই রংকে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য এবং ব্যয়বহুল রংগুলির মধ্যে ধরা হয়।

কী এই টাইরিয়ান পার্পল?

টাইরিয়ান পার্পল হল এক বিশেষ ধরনের বেগুনি রং, যা প্রাচীনকালে রাজপরিবার ও অভিজাতদের পোশাকে ব্যবহার করা হত। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই রংয়ের পোশাক পরা প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ এর দাম ছিল আকাশছোঁয়া।

এই রং তৈরি হত মুরেক্স সি স্নেল নামে একধরনের সামুদ্রিক শামুক থেকে। শোনার পর বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যিই হাজার হাজার শামুক থেকে অল্প পরিমাণ রং তৈরি করা যেত।

গবেষকদের মতে, প্রায় ১০ হাজার শামুক থেকে মাত্র ১ গ্রাম টাইরিয়ান পার্পল পাওয়া সম্ভব হত। ভাবুন একবার, এত সামান্য রং তৈরি করতে কত বিশাল পরিশ্রম ও সময় লাগত!

কেন এত দামি ছিল এই বেগুনি রং?

আজকের দিনে বাজারে অসংখ্য রং সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু প্রাচীন যুগে রং তৈরি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজ। বিশেষ করে টাইরিয়ান পার্পল তৈরির প্রক্রিয়া ছিল ভয়ঙ্কর জটিল।

আরও পড়ুন :  ইয়ামালের জাদুতে এমবাপেদের হারিয়ে ফ্রান্সকে উড়িয়ে দিল দে লা ফুয়েন্তের মাস্টারপ্ল্যান

প্রথমে সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ মুরেক্স শামুক সংগ্রহ করা হত। তারপর সেই শামুকের শরীরের একটি বিশেষ গ্রন্থি থেকে নির্যাস বের করা হত। সেই নির্যাসকে নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুত করতে হত। পুরো প্রক্রিয়ায় ভয়ানক দুর্গন্ধও তৈরি হত।

এই কারণেই টাইরিয়ান পার্পল সাধারণ কোনও রং ছিল না। এটি ছিল ক্ষমতা, ঐশ্বর্য এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।

রাজা-সম্রাটদের প্রিয় রং

ইতিহাসবিদেরা মনে করেন, রোমান সাম্রাজ্যে এই বেগুনি রং ছিল রাজকীয়তার প্রতীক। সম্রাট, রাজপরিবারের সদস্য এবং অত্যন্ত ধনী অভিজাতরাই মূলত এই রংয়ের পোশাক ব্যবহার করতেন।

অনেক সময় সাধারণ মানুষের জন্য এই রং ব্যবহার নিষিদ্ধও ছিল। কারণ এটি ছিল বিশেষ মর্যাদার পরিচয়। আজ যেমন বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পোশাক সামাজিক অবস্থান বোঝায়, তখন ঠিক তেমনই কাজ করত টাইরিয়ান পার্পল।

ফলে ইংল্যান্ডের এই সমাধিক্ষেত্রে এমন কাপড়ের উপস্থিতি প্রমাণ করছে, সেখানে সমাধিস্থ ব্যক্তিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিবার থেকে এসেছিলেন।

শিশুদের সমাধিতে কেন এত দামি পোশাক?

গবেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এটিই। কারণ সমাধিগুলিতে মূলত শিশুদের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। এত ছোট শিশুদের এত মূল্যবান পোশাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল কেন?

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ওই শিশুরা হয়তো কোনও সম্ভ্রান্ত বা রাজপরিবারের সদস্য ছিল। প্রাচীন সমাজে অনেক সময় পরিবারের মর্যাদা ও সম্পদ প্রদর্শনের জন্য মৃত ব্যক্তিকেও অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে সমাধিস্থ করা হত।

আরও পড়ুন :  ভারতের সবচেয়ে রহস্যময় গ্রাম জাটিঙ্গা : সত্যিই কি পাখিরা আত্মহত্যা করে?

এই আবিষ্কার সেই সময়কার সামাজিক বৈষম্য ও ধনী-গরিবের পার্থক্যের ছবিও তুলে ধরছে।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

টাইরিয়ান পার্পল রংয়ের কাপড় এত বছর পরেও খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। কারণ কাপড় সাধারণত সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যায়। তার উপর এত সূক্ষ্ম সোনার জরি এবং রং অক্ষত অবস্থায় টিকে থাকা গবেষকদের কাছেও বিস্ময়ের বিষয়।

এই আবিষ্কারের মাধ্যমে রোমান যুগের বাণিজ্য, বিলাসিতা এবং পোশাক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে রোমান প্রভাব কতটা গভীর ছিল, তা বুঝতেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

ইতিহাসের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়

প্রতিদিন পৃথিবীর নানা প্রান্তে নতুন নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সামনে আসছে। তবে কিছু আবিষ্কার শুধু ইতিহাস নয়, মানুষের কল্পনাকেও নাড়িয়ে দেয়। ইংল্যান্ডের এই প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে পাওয়া টাইরিয়ান পার্পল তেমনই এক বিস্ময়।

একসময় যে রং ছিল সোনার চেয়েও দামি, আজ তা ইতিহাসের পাতায় এক রহস্যময় স্মৃতি হয়ে রয়েছে। আর সেই স্মৃতিকেই আবার নতুন করে সামনে এনে দিল কয়েক হাজার বছর পুরনো এক সমাধি।

সময়ের স্রোতে বহু সভ্যতা হারিয়ে গেলেও, তাদের গল্প কিন্তু এখনও মাটির নিচে বেঁচে আছে। আর প্রতিটি নতুন আবিষ্কার যেন অতীতের দরজা একটু একটু করে খুলে দিচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ